দিনটি ছিল ২৯ নভেম্বর ২০২৫। নালিখালী উপকেন্দ্রের খ্রীস্টীয় ধর্মাবলম্বীদের জন্য এটি ছিল পরম পূজনীয় ও বিশেষ আনন্দের দিন। তবে আধুনিক সভ্যতার উৎকর্ষ সাধনে ন্যূনতম নাগরিক সুবিধার ঘাটতি এখনো স্পষ্ট ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার দুল্লা ইউনিয়নের এই প্রত্যন্ত এলাকা নালিখালীতে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন—সবকিছুই যেন এখনো নাগালের বাইরে। একসময় পাকা বা ইটসলিং করা রাস্তাগুলোর অবস্থাও বর্তমানে বেহাল। কৃষি অর্থনীতির জোন হিসেবে পরিচিত নালিখালী সেদিন ছিল নতুন সাজে সজ্জিত।
বেরসিক শীত উপেক্ষা করে সূর্যোদয়ের পরপরই নালিখালী আর্চ উপকেন্দ্রের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা জেগে ওঠেন। উপলক্ষ—১৯২৭ সালে প্রতিষ্ঠিত সাধু ভিনসেণ্ট ডি’পল গীর্জার নবনির্মিত ভবনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। উদ্বোধন করতে আসেন ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশের পরম শ্রদ্ধাভাজন খ্রীস্টীয় ধর্মযাজক বিশপ পনেন পল কুবি সিএসসি। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে পরম পূজনীয় এই ধর্মগুরুর সফরে সঙ্গী ছিলেন শীর্ষস্থানীয় পুরোহিত, সরকারি-বেসরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, শিক্ষক, সাংবাদিক ও সমাজের বিভিন্ন স্তরের বিশিষ্টজনেরা।
গীর্জা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যেন কোনো ধরনের ব্যত্যয় না ঘটে—সে জন্য স্থানীয় আয়োজকদের ছিল সর্বোচ্চ প্রস্তুতি। নবনির্মিত গীর্জা ও পাশের প্যান্ডেল, সারি সারি চেয়ার, অতিথি অভ্যর্থনায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় সুসজ্জিত তোরণ, ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী বিশেষ পোশাকে অপেক্ষমাণ নারী-পুরুষের উৎকণ্ঠা, ঢাক-ঢোল-বাঁশির সুর—সবকিছু মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সকাল ১০টার কুয়াশামুক্ত মিষ্টি রোদ পুরো আয়োজনে যোগ করে ভিন্ন এক আবহ।
অপেক্ষার অবসান ঘটে সকাল ১০টা ২০ মিনিটে। একে একে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিভিন্ন ক্যাথলিক চার্চের ধর্মযাজকদের বহনকারী গাড়ি অনুষ্ঠানস্থলে এসে পৌঁছায়। এরপর উপস্থিত হন কাঙ্ক্ষিত ধর্মগুরু বিশপ পনেন পল কুবি সিএসসি। ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী পা ধৌতকরণ, কটি ও মাইটার (Mitre) পরানো, লাঠি উপহার, বিশেষ খাবার পরিবেশন এবং ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীত ও নৃত্যের মাধ্যমে তাঁকে বরণ করে নেন স্থানীয় ভক্তবৃন্দ। এ সময় ড্রোনের মাধ্যমে পুরো অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হয়।
দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে ফিতা কেটে স্মৃতি গ্যালারির উদ্বোধন, পুষ্পবৃক্ষ রোপণ, নবনির্মিত গীর্জার চাবি হস্তান্তর ও শপথ পাঠ, লাল ফিতা কেটে গীর্জায় প্রবেশ এবং বিশেষ ব্যবস্থাপনায় শুদ্ধিকরণ সম্পন্ন হয়। পরে ভক্তবৃন্দের উপস্থিতিতে পবিত্র বাইবেল পাঠের মাধ্যমে উদ্বোধনী মূল পর্বের সমাপ্তি ঘটে।
ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে পীরগাছা ধর্মপল্লীর শ্রদ্ধেয় ফাদার এ্যাপোলো রোজারিও সিএসসি সভাপতিত্ব করেন। সফরসঙ্গী ও আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশের ভিকার জেনারেল শ্রদ্ধেয় মন্সিনিয়র ফাদার শিমন হাচ্ছা, চ্যান্সেলর শ্রদ্ধেয় ফাদার বাইওলেন চাম্বুগং, শিক্ষা কর্মকর্তা শ্রদ্ধেয় ফাদার অশেষ দিও, নটর ডেম কলেজ ময়মনসিংহের অধ্যক্ষ ড. ফাদার থাদেউস হেম্ব্রম সিএসসি, ছাত্র পরিচালক ফাদার মৃনাল ম্রং সিএসসি, পীরগাছা ধর্মপল্লীর সহকারী পাল পুরোহিত ফাদার রুবেল বিশ্বাস সিএসসি, ডাকুয়া ধর্মপল্লীর পাল পুরোহিত সুনির্মল মৃ, জলজত্র ধর্মপল্লীর ফাদার সুভাস কস্তা সিএসসি, ফাদার ড. বিজন কুবি, ফাদার টিটুস মৃ, ফাদার বিপিন নকরেক, ফাদার সামুয়েল পাথাং, ফাদার তপন ম্রং, ফাদার খোকন নকরেক সিএসসি, ফাদার আনন্দ মন্ডল সিএসসি, ফাদার ডেনিশ দারু, সিস্টার জসিন্তা মেরী ম্রং (প্রভিন্সিয়াল, সালেসিয়ান সম্প্রদায়)সহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সিস্টারবৃন্দ।
এছাড়া উপস্থিত ছিলেন মানবাধিকার কমিশনের যুগ্ম সচিব সেবাস্টিন রেমা, পরিসংখ্যান মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হেমন্ত হেনরী কুবি, পীরগাছা ধর্মপল্লীর প্যারিশ কাউন্সিলের সহসভাপতি প্রনাথ মৃ, পীরগাছা থাংয়ানি ক্রেডিট চেয়ারম্যান মিহির মৃ, সমাজসেবক ও আদিবাসী নেতা অজয় মৃ, কারিতাস ডাইরেক্টরস (CDI) পরিচালক টিওফিল নকরেক, কারিতাস প্রোগ্রামস পরিচালক অপূর্ব ম্রং, মিশনারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকবৃন্দ, বিভিন্ন গ্রাম কাউন্সিলের সদস্য, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক এবং বিপুল সংখ্যক স্থানীয় খ্রীস্টভক্ত।
অনুষ্ঠান শেষে সাধু ভিনসেণ্ট ডি’পল নালিখালী উপকেন্দ্রের সম্পাদক হিউবার্ট মৃ বলেন, ‘আপনাদের উপস্থিতি আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা ও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।’ তিনি গীর্জা নির্মাণ ও উদ্বোধনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। উল্লেখ্য, ১৯২৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই গীর্জার মাধ্যমে খ্রীস্টীয় ধর্মাবলম্বীরা দীর্ঘদিন ধরে তাদের আরাধনার মাধ্যমে প্রভু যীশুর সান্নিধ্য লাভ করে আসছেন।
অনুষ্ঠান শেষে সাধু ভিনসেণ্ট ডি’পল গীর্জার ৭ সদস্যবিশিষ্ট নবগঠিত কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে সভাপতি মনোনীত হন জনেন্দ্র স্নাল এবং সম্পাদক হিউবার্ট মৃ। কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন—কোষাধ্যক্ষ রুবেন ম্রং, সদস্য বলরাম ম্রং, সদস্যা সুফলা দারু, সদস্য মুক্তা রুগা এবং সদস্যা চম্পা রেমা।

উজ্জ্বল বাংলাদেশ