প্রিন্ট এর তারিখঃ মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ৩১ চৈত্র ১৪৩৩

আজ পয়লা বৈশাখ: প্রাণে প্রাণে ছড়িয়ে যাবে নতুন আলো

উজ্জ্বল বাংলাদেশ ডেস্ক

বঙ্গাব্দ ১৪৩২-এর সূর্য শেষবারের মতো ডুব দিয়েছে গতকাল সোমবার। আজ মঙ্গলবার ভোরে পূর্ব দিগন্তে উঁকি দিয়েছে নতুন বছরের প্রথম সূর্য। জাতির প্রত্যাশা, সেই নতুন সূর্যের আলো ছড়িয়ে যাবে প্রাণে প্রাণে। উৎসবপ্রিয় এ দেশের মানুষ আজ নতুন বাংলা বছরকে বরণ করে নেবেন গান, কবিতা আর শোভাযাত্রার মাধ্যমে।

বাংলা নববর্ষ এ দেশের প্রধান সর্বজনীন উৎসব। ধর্মবর্ণ-নির্বিশেষে সবাই অংশ নেন এতে। কৃষিকাজ আর সম্রাটকে কর দেওয়ার সূত্রে বৈশাখকেন্দ্রিক বাংলা বর্ষপঞ্জি চালু হলেও তা আর নিছক কৃষিকেন্দ্রিক থাকেনি। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়েছে সমাজের সর্বস্তরে।

এখন বরং বিভিন্ন মহানগরেই হয় বাংলা নববর্ষের সবচেয়ে বড় উদ্‌যাপনগুলো। ঐতিহ্যের পাশাপাশি বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপন এক বিশাল বাণিজ্যিক কার্যক্রমও।

পয়লা বৈশাখ বর্ষবরণের উৎসব। তবে একসময় এ ভূখণ্ডের মানুষের জন্য বর্ষবরণের চেয়েও বড় কিছু হয়ে ওঠে দিবসটি। পাকিস্তানি শাসনামলে বাঙালি সংস্কৃতিবিদ্বেষী স্বৈরশাসকদের দমনপীড়নের মুখে বৈশাখ উদ্‌যাপন হয়ে উঠেছিল প্রতিরোধের হাতিয়ার। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীর স্বাত্যন্ত্র ও আত্মপরিচয়কে তুলে ধরতে ঢাকার সংস্কৃতিকর্মীদের উদ্যোগে গঠিত হয়েছিল ছায়ানট। সংগঠনটি রমনার বটমূলে ১৯৬৭ সালে প্রথমবারের মতো আয়োজন করে ঐতিহ্যবাহী বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের। সেই থেকে পয়লা বৈশাখের ভোরে রমনার বটমূলে সম্মিলিত কণ্ঠে গানে-কবিতায় হয়ে আসছে নতুন বছরের আবাহন। রাজধানীসহ দেশজুড়ে ক্রমেই যুক্ত হয় আরও নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক আয়োজন।

কয়েক দশক ধরে বর্ষবরণের আয়োজনকে আরও রঙিন করে তুলেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের (আগের ইনস্টিটিউট) বর্ণিল শোভাযাত্রা।

এবারও মহাসমারোহে আয়োজিত হতে যাচ্ছে বর্ষবরণ। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও করপোরেট প্রতিষ্ঠান রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।

দীর্ঘদিনের প্রথামতো ছায়ানট রমনাপার্কে ভোর সোয়া ৬টায় গান ও কথার মাধ্যমে নতুন বছরকে স্বাগত জানাবে। আয়োজনে থাকবে প্রকৃতি, মানুষ ও দেশকে ভালোবাসার গান। বিশেষ আয়োজনে থাকবে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রাখা প্রখ্যাত গণসংগীতজ্ঞ সলিল চৌধুরী এবং পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনের খ্যাতিমান গীতিকার-সুরকার মতলুব আলীর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি। অনুষ্ঠানে থাকবে ৮টি সমবেত এবং ১৪টি একক কণ্ঠের গান ও ২টি পাঠ। অংশ নেবেন প্রায় দুই শ শিল্পী। এবারের বর্ষবরণ আয়োজনে ‘ভয়কে জয় করে সব প্রতিকূল আবর্জনা দূর করে মানবমুখী হওয়ার’ আহ্বান জানাবে ছায়ানট।

শোভাযাত্রার এবারের প্রতিপাদ্য ‘নববর্ষের ঐক্য, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’। এবারের শোভাযাত্রায় আবহমান বাংলার ঐতিহ্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা তুলে ধরতে পাঁচটি মোটিফ রাখা হয়েছে—লাল ঝুঁটির মোরগ, কাঠের হাতি, পায়রা, দোতরা ও টেপা পুতুলের কায়দায় তৈরি করা ঘোড়া। পাশাপাশি বাঙালির ঐতিহ্যের প্রতীক ছোট ছোট নানা উপকরণ যুক্ত হবে শোভাযাত্রায়। থাকবে পাঁচটি পটচিত্রও—যার বিষয়বস্তু বাংলাদেশ, গাজীরপট, সম্রাট আকবর, বনবিবি ও বেহুলা। শোভাযাত্রাটি চারুকলা অনুষদ থেকে শুরু হয়ে শাহবাগ থানা পর্যন্ত গিয়ে আবার উল্টোমুখে ঘুরে রাজু ভাস্কর্য, দোয়েল চত্বর ও বাংলা একাডেমি হয়ে চারুকলা অনুষদে ফিরে আসবে।

নিরাপত্তার কারণে আইনশৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, পয়লা বৈশাখের উৎসব-অনুষ্ঠানের কেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের মুখোশ পরে প্রবেশ করা যাবে না। ব্যাগ বহনও নিষিদ্ধ। তবে চারুকলা অনুষদের শোভাযাত্রার সময় মুখোশ হাতে নিয়ে প্রদর্শন করা যাবে। বেলুন, ফেস্টুন ও আতশবাজি নিষিদ্ধ। কান ফাটানো শব্দের ভুভুজেলা বাঁশি বাজানো ও বিক্রি না করারও অনুরোধ জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ঢাবি ক্যাম্পাসে সব অনুষ্ঠান বিকেল ৫টার মধ্যে শেষ করতে হবে। বিকেল ৫টার পর আর ক্যাম্পাসে প্রবেশ করা যাবে না, শুধু বের হওয়া যাবে। ছাত্র-শিক্ষককেন্দ্রের (টিএসসি) সামনে থাকবে বিশ্ববিদ্যালয়ের হেলপ ডেস্ক, কন্ট্রোলরুম ও অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প। হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল মাঠসংলগ্ন এলাকা, টিএসসির আশপাশ, দোয়েল চত্বর এবং কার্জন হল এলাকায় স্থাপন করা হবে মোবাইল পাবলিক টয়লেট।

ধানমন্ডির ২৭ নম্বর সড়কে ‘বর্ষবরণ পর্ষদ’-এর আয়োজনে পয়লা বৈশাখের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ আয়োজিত হবে। এতে থাকবে গান, আবৃত্তি, নৃত্য, মূকাভিনয়ের আয়োজন। সকাল ৯টায় সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত ‘ধনধান্য পুষ্পভরা’ এবং ‘এসো হে বৈশাখ’ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হবে এই আয়োজন। ১৯৮৯ সালে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে শুরু হওয়া চারুকলার শোভাযাত্রাটি পরের বছর থেকে দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় মঙ্গল শোভাযাত্রা নামে আয়োজিত হয়ে আসছিল। জাতিসংঘ মঙ্গল শোভাযাত্রা নামেই এ বর্ণাঢ্য আয়োজনকে বৈশ্বিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এর নাম নিয়ে একটি মহল আপত্তি তোলে। পুরোনো নাম বহাল রাখার পক্ষের সংস্কৃতিকর্মীরা ধানমন্ডি ২৭-এর এই বিকল্প শোভাযাত্রার আয়োজন করেছেন।

রাজধানীর নানা জায়গায় বর্ষবরণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও তার আওতাধীন শিল্পকলা একাডেমি আয়োজন করেছে পাঁচ দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের। এতে থাকবে আলোচনা, লোকশিল্প প্রদর্শনী, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যাত্রাপালা, জারি গান, পুঁথিপাঠ, কবিগান, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর পরিবেশনা, অ্যাক্রোবেটিক প্রদর্শনীসহ নানা আয়োজন। বাংলা একাডেমি বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপন শুরু করবে সকালে সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে। থাকবে আলোচনা, বইমেলা, সপ্তাহব্যাপী বৈশাখী মেলা ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী।

এ ছাড়াও জাতীয় কবিতা পরিষদ, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, সত্যশব্দ সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র, বিপ্লবী সাংস্কৃতিক ঐক্য, সপ্তসুর সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র, আদি ঢাকা সাংস্কৃতিক জোট, সুরের ধারাসহ বহু সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন বর্ষবরণের আয়োজন করেছে। বর্ষবরণ উপলক্ষে আয়োজন থাকছে গুলশানের আলোকি, বনানীর যাত্রাবিরতি, বনানীর কামাল আতাতুর্ক পার্ক, বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্র, ভাটারা মাদানী অ্যাভিনিউয়ের শেফস টেবিল কোর্ট সাইডে।

বিদেশের বাঙালি-অধ্যুষিত এলাকায়ও থাকবে নানা বৈশাখী আয়োজন। অনলাইনেও বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে বর্ষবরণে যুক্ত হবে।

 

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ সাদেকুল ইসলাম (কবি, সাহিত্যিক, সংগঠক), উপদেষ্টাঃ মোঃ আঃ হান্নান মিলন, সম্পাদক ও প্রকাশকঃ রাজিবুল করিম রোমিও-এম, এস, এস (সমাজ কর্ম), নির্বাহী সম্পাদকঃ কামরুন নেছা তানিয়া, ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুল আজিজ, সহ-ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ খন্দকার আউয়াল ভাসানী, বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ মিজানুর সরকার

প্রিন্ট করুন