ভারতের সংগীতের আকাশ থেকে খসে পড়ল এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। কিংবদন্তি প্লেব্যাক গায়িকা আশা ভোঁসলে শনিবার রাতে মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন ১২ এপ্রিল। বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। তাঁর প্রয়াণে স্তব্ধ গোটা উপমহাদেশ। আট দশক ধরে যে কন্ঠ কোটি হৃদয়ের স্পন্দন তুলেছে, আজ সেই কন্ঠ চিরতরে থেমে গেল। আশা ভোঁসলের জন্ম ১৯৯৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের সাংলিতে। জন্ম নাম আশা মঙ্গেশকর। বাবা ছিলেন প্রখ্যাত নাট্য শিল্পী ও শাস্ত্রীয় সংগীত দিনোনাথ মঙ্গেশকর। মা সেবন্তী মঙ্গেশকর ছিলেন গৃহিণী, কিন্তু সংগীতের আবহেই সংসার গড়েছিলেন। দিনোনাথ মঙ্গেশকর মারাঠি থিয়েটারের কিংবদন্তি এবং গোয়ালিয়র ঘরানার শাস্ত্রীয় সংগীত শিল্পী ছিলেন। তাঁর হাত ধরেই মঙ্গেশকর পরিবারের পাঁচ ভাই বোনের সঙ্গীতে হাতে খড়ি। বাবা দীননাথের অকাল প্রয়াণে মাত্র ৯ বছর বয়সে পিতৃহারা হন আশা। তারপর থেকেই বড় দিদি লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে কাঁধে কানস মিলিয়ে সংসারের হাল ধরে। মঙ্গেশকর পরিবার ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে এক বিরল অধ্যায়। বড়দিদি লতা মঙ্গেশকর ভারতের নাইটেঙ্গেল। ভারতরত্ন সম্মান প্রাপ্ত। ছোট বোন ঊষা মঙ্গেশকর প্লেব্যাক ও ভক্তি গীতির জনপ্রিয় শিল্পী। আর এক বোন মিনা খাদিকর মারাঠি ও হিন্দি গানের জনপ্রিয় শিল্পী। একমাত্র ভাই হৃদয়নাথ মঙ্গেশকর প্রখ্যাত সুরকার ও গায়ক। এই পরিবার থেকে ভারত পেয়েছে শাস্ত্রীয়, ভজন, গজল, ভাব সংগীত থেকে শুরু করে আধুনিক প্লেব্যাক সমস্ত ঘরানার দিকপাল। আশা ভোঁসলে ১২ হাজারেরও বেশি গান গেয়ে সম্রাজ্ঞী হয়েছেন। ১৯৪৩ সালে মারাঠি ছবি মাঝা বাল দিয়ে মাত্র ১০ বছর বয়সে প্লেব্যাক শুরু। হিন্দিতে প্রথম গান ১৯৪৮ সালে চুনারিয়া ছবিতে। পঞ্চাশের দশকে ওপি নায়ারের সুরে মাঙ্গ কে সাথ তুমহারা, আই ইয়ে মেহেরবান, ইয়ে হাই বোম্বে মেরি জান, তাঁকে ক্যাবারে কুইন বানায়। ৭০ থেকে ৮০ দশকে স্বামী রাহুল দেব বর্মনের সঙ্গে জুটি বেঁধে দম মারো দম, পিয়া তু আব তো আজা, চুরালিয়া হাই তুমনে, মেরা কুছ সামান উপহার দেন। গজল, কাওয়ালী, পপ, ফোক, ডিস্কো সহ কুড়িটিরও বেশি ভাষায় বারো হাজারের বেশি গান রেকর্ড করেছিলেন তিনি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বয় জর্জ, বয়জোন, মাইকেল স্টাইকের সঙ্গেও তিনি কাজ করেছেন। ২০২৩ সালে ৯০ বছর বয়সেও দুবাইয়ে লাইভ কনসার্ট করেছেন। ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মান ২০০০ সালে তিনি দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে ভূষিত হন। ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান পদ্মবিভূষণ পান ২০০৮ সালে। শ্রেষ্ঠ নারী প্লেয়ার গায়িকা হিসেবে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান দুইবার। সাতবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান। পরে লাইফ টাইম এচিভমেন্ট নিয়ে তিনি প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ান। গ্র্যামি মনোনয়ন দুইবার। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য , পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গান রেকর্ড করার জন্য তিনি ২০১১ সালে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড করেন। আশা ভোঁসলের পুত্র আনন্দ ভোঁসলে মায়ের মৃত্যুর খবর সংবাদ মাধ্যমকে জানান। যদিও এর আগে আশা ভোঁসলের মৃত্যুর ব্যাপারে ভুয়া খবর পরিবেশিত হয়েছিল। আশা ভোঁসলের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি এক্স হ্যান্ডেল এ লিখেছেন, আশা ভোঁসলে অসাধারণ সংগীত যাত্রা দশকের পর দর্শক আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর কন্ঠে ছিল চিরন্তন দীপ্তি। আত্মা হোক বা প্রাণবন্ত কম্পোজিশন সবেতেই তিনি অতুলনীয় ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, অসংখ্য বাংলা গান গেয়ে আশা ভোঁসলে বাংলাকে বিশ্বের দরবারে উপস্থাপিত করেছেন। বাংলার সঙ্গে তাঁর নিবিড় টান ছিল। এছাড়াও শোক প্রকাশ করেছেন এ আর রহমান, শ্রেয়া ঘোষাল, সনু নিগম, শংকর মহাদেবন সহ অগণিত শিল্পী। শচীন টেন্ডুলকার ও ব্রেটলিও শোক প্রকাশ করেছেন। ব্রেট লি ২০০৭ সালে তাঁর সঙ্গে ইউ আর দি ওয়ান ফর মি গান করেছিলেন। আশা ভোঁসলে শুধু গায়িকা ছিলেন না, তিনি নিজেই এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিলেন। লতা মঙ্গেশকরের ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজের আলাদা সাম্রাজ্য গড়া, পুরুষতান্ত্রিক ইন্ডাস্ট্রিতে সাহসী গান গাওয়া, ৯০ বছর বয়সেও মঞ্চ কাপানো সবেতেই তিনি ছিলেন এক অনন্যা। পিয়া তু, দম মারো দম, চুরা লিয়া, দিল চিজ কয়া হাই, এই গানগুলি যতদিন বাজবে, যতদিন কোন নায়িকা পর্দায় ঠোঁট মেলাবে, যতদিন কোন কিশোরী আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তার গান গাইবে-আশা ভোঁসলে ততদিন পৃথিবীর বুকে অমর হয়ে থাকবেন, চিরন্তন হয়ে থাকবেন।

লুতুব আলি