গ্রীষ্মের প্রখর তাপপ্রবাহ, বর্ষার ঝুম বৃষ্টি কিংবা কনকনে ঠান্ডা শীতের সকাল—খেটে খাওয়া মানুষের প্রশান্তি মিলত রাস্তার পাশে টংদোকানে এক কাপ চায়ের চুমুকে। কিন্তু দোকানিরা মাইকে ঘোষণা দিয়ে দাম বাড়ানোয় সেই প্রশান্তিও ম্লান হয়ে গেল। বাধ্য হয়ে চা পানে কাটছাঁট করছেন শ্রমিক শ্রেণির মানুষ।
নাটোরের গুরুদাসপুরে গতকাল শনিবার থেকে চা-দোকানিদের পক্ষে প্রতি কাপ রং চা হঠাৎ দুই টাকা বাড়িয়ে ৮ টাকা মূল্য নির্ধারণ করা হয়। মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি এলাকায় মাইকিং করে সব পেশার মানুষকে অবগতও করা হয়। এতে বিপাকে পড়েন শ্রমজীবী খেটে খাওয়া মানুষ। রং চায়ের পাশাপাশি প্রতি কাপ ব্ল্যাক কফি ১০ টাকা, দুধ কফি ও দুধ চা ২০ টাকা মূল্য নির্ধারণ করেছেন দোকানিরা। পাশাপাশি বেড়েছে পানের দাম। মূল্যবৃদ্ধির এই তালিকা প্রতিটি দোকানে টাঙিয়েও দেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত শুক্রবার বিকেলে গুরুদাসপুর পৌরসভাসহ আশাপাশের কমপক্ষে ৪০ জন চায়ের দোকানি মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে একটি সভা করেন। সেখানে সর্বসম্মতিক্রমে বাড়তি দাম নির্ধারণ করা হয়। দোকানিদের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং নিজেদের অধিকার রক্ষায় ‘চা-ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি’ নামে একটি সংগঠনও ঘোষণা করেন তাঁরা।
সংগঠনের পক্ষে দাবি করা হয়, গ্যাস, পেট্রল, কেরোসিনসহ সব ধরনের পণ্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে তাঁদের আয় সংগতিপূর্ণ নয়। তা ছাড়া চায়ের দোকানের অন্যতম অনুষঙ্গ চা, চিনি, গ্যাস, খড়ির সঙ্গে বিদ্যুৎ ও দোকান ভাড়া বেড়েছে। ফলে চায়ের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন তাঁরা।
সমিতিভুক্ত বেশির ভাগ দোকান গড়ে উঠেছে সড়কের পাশে কিংবা জনবহুল এলাকার পরিত্যক্ত জায়গায়। ভ্যান, রিকশা, অটোচালক ও দিনমজুর শ্রেণির মানুষ এসব দোকানের খদ্দের। ট্রিপের মধ্যে নিজেদের ক্ষুধা নিবারণ ও শারীরিক-মানসিক ক্লান্তি দূর করতে দোকানে বসে একটি বিস্কুট, দুই গ্লাস পানি পানের পর এক কাপ চা ও একটি পান খেয়ে থাকেন তাঁরা। সাময়িক ক্ষুধা নিবারণের পর শরীর ও মন চাঙা করে শক্তি বাড়িয়ে আবার ফেরেন উপার্জনের খোঁজে।
ভ্যানচালক বাটুল মিয়া বলেন, দিনে ২০০ টাকা ভাড়ায় ব্যাটারিচালিত ভ্যান চালান তিনি। ভোরে না খেয়ে বের হন। ফাঁকে ফাঁকে চা-বিস্কুট খেয়ে দুপুর গড়িয়ে বাড়ি ফেরেন। দিনে ৪ থেকে ৬ কাপ চা ও বিস্কুট খাওয়া হয় তাঁর। রয়েছে পান খাওয়ার অভ্যাসও। দিনে ৫০ থেকে ৬০ টাকা বিল দিতে হয়। মূল্যবৃদ্ধির কারণে চায়ের বাজেট সংকুচিত করতে হয়েছে।
বাটুল মিয়ার মতো আরও কয়েকজন শ্রমজীবী মানুষ আক্ষেপ করে বলেন, বাজার ব্যবস্থার ঊর্ধ্বগতির কারণে আয়ের টাকায় সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাঁদের। চায়ের পুরোনো অভ্যাস রয়েছে, সেখানেও ‘খাঁড়ার ঘা’ পড়ল। এভাবে জীবন চালানো দায়।
পৌর শহরের চাঁচকৈড় বাজারের চা-দোকানি শুকুমার হালদার বলেন, ‘১ হাজার ৪০০ টাকার গ্যাস সিলিন্ডার ১ হাজার ৯০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। সঙ্গে বেড়েছে চিনি, চা-পাতা, কফি ও গরুর দুধের দাম। দাম বাড়ানো ছাড়া টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।’
চা ও পান বিক্রেতা শামীম হোসেন জানান, খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ তাঁর দোকানে বেশি আসে। চা ও পানের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিক্রি কমেছে। তবে এই সমস্যা বেশি দিন থাকবে না বলে মনে করেন তিনি। কারণ, সবার রয়েছে চা ও পানে আসক্তি।
রোজী মোজাম্মেল মহিলা অনার্স কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান মাজেম আলী মলিন বলেন, সরকারের অগ্রধিকার হওয়া উচিত নিত্যপণ্যের মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখা। এ ক্ষেত্রে ভোক্তাদের বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে, বুঝে জীবন যাপন করতে হবে।

উজ্জ্বল বাংলাদেশ ডেস্ক