রাজা-রানির গল্প এখনো পৃথিবীতে আছে? হ্যাঁ, আছে। এখনো তাঁদের রাজপ্রাসাদ আর রাজকীয় জৌলুশ আছে বিভিন্ন দেশে। আছে রাজকীয় সেনা আর তাদের মনোমুগ্ধকর কুচকাওয়াজ। এমনকি আপনার ভীষণ পছন্দের কোনো কোনো দেশেও কিন্তু চালু আছে রাজতন্ত্র, মানে রাজাদের শাসন। সেসব দেশের নাম শুনে হয়তো আপনার চোখ কপালে উঠবে। কিন্তু এই রাজতন্ত্র নিশ্চয় আর মধ্যযুগের মতো নেই। কথায় কথায় এখন হয়তো কাউকে আর শূলে চড়ানো হয় না; কিংবা কারও দিকে ছুড়ে দেওয়া হয় না সোনার মোহর। তারপরেও আছে রাজাদের শাসন।
বলে রাখা ভালো, রাজতন্ত্রের ব্যবস্থাতেও এসেছে বদল। কিছু দেশে আছে পূর্ণ রাজতন্ত্র, আর কিছু কিছু দেশে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র।
পূর্ণ রাজতন্ত্র
এ ধরনের দেশে রাজা বা সুলতানের হাতে থাকে রাষ্ট্রের প্রায় সব ক্ষমতা। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে—
সৌদি আরব, ব্রুনেই, ওমান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইসোয়াতিনি বা সোয়াজিল্যান্ড
সাংবিধানিক রাজতন্ত্র
এ ধরনের দেশে রাজা বা রানি প্রতীকীভাবে রাষ্ট্রের প্রধান থাকেন। কিন্তু প্রকৃত শাসন চলে নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে। ইউরোপ ও এশিয়া—এ দুটি মহাদেশে এমন বেশ কিছু রাষ্ট্রের মধ্যে আছে—
ইউরোপে: যুক্তরাজ্য, সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, মোনাকো, লিচেনস্টেইন।
এশিয়ায়: জাপান, থাইল্যান্ড, জর্ডান, কুয়েত, ব্রুনেই, ভুটান, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া।
কমনওয়েলথ
যে দেশগুলো এখনো ব্রিটিশ রাজা বা রানিকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মেনে চলে, সেসব দেশ কমনওয়েলথভুক্ত দেশ। এসব দেশের মধ্যে আছে— কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, জ্যামাইকা, বাহামাস, পাপুয়া নিউগিনি।
এসব দেশ ছাড়া আরও কিছু ছোট দ্বীপরাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে আছেন যুক্তরাষ্ট্রের রাজা বা রানি।
কোন দেশে রাজা বেশি ক্ষমতাবান
পূর্ণ রাজতন্ত্র ব্যবস্থা রয়েছে যেসব দেশে, সেসব দেশের রাজারা এখনো ক্ষমতাবান। তবে যদি তুলনা করা যায়, সে ক্ষেত্রে তাদের ক্ষমতার কিছু উঁচু-নিচু হয় বটে। সেভাবে দেখলে একটা তুলনামূলক চিত্র দাঁড় করানো যায়। যেমন—
সৌদি আরব
পূর্ণ রাজতন্ত্রের উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশ। এখন দেশটির রাজা যুবরাজ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ। তিনি দেশটির রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান। তাঁর হাতেই আছে আইন, প্রশাসন, সামরিক—সব ক্ষেত্রের চূড়ান্ত ক্ষমতা। দেশটিতে সংসদ থাকলেও তা নির্বাচিত নয়, বরং পরামর্শমূলক। এসব কারণে সৌদি আরবকে আজকের বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজতন্ত্রগুলোর একটি ধরা হয়।
ব্রুনেই
দেশটির সুলতান হাসানাল বলকিয়াহ। তাঁর পুরো নাম হাজি হাসানাল বলকিয়াহ মুইজ্জাদ্দিন ওয়াদ্দৌলাহ। ১৯৬৭ সালের ৫ অক্টোবর থেকে ব্রুনেইয়ের ২৯তম এবং বর্তমান সুলতান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি একাধারে দেশটির প্রধানমন্ত্রী, অর্থ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী। অর্থাৎ তাঁর হাতেই প্রায় সম্পূর্ণ ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত।
ইসোয়াতিনি বা সোয়াজিল্যান্ড
১৯৬৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে দেশটি এখন আফ্রিকা মহাদেশের একটি রাজতান্ত্রিক দেশ। নিম্ন-মধ্যম আয়ের আফ্রিকান এই দেশের রাজার নাম এমসওয়াতি তৃতীয়। ২০১৮ সালে রাজা দেশটির নাম পরিবর্তন করে সোয়াজিল্যান্ডের বদলে রাখেন ইসোয়াতিনি, এর অর্থ সোয়াজি জাতির ভূমি। গর্বের নাম নিশ্চয়। কিন্তু দেশটিতে রাজাই সব। তিনি অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেন বলে জানা যায়।
সবচেয়ে পুরোনো রাজতন্ত্র কোনটি
এখানে একটি চমক আছে। একসময় বলা হতো, ব্রিটিশ রাজ্যে সূর্য ডোবে না। অর্থাৎ ব্রিটিশরা তাদের রাজ্য প্রায় পুরো পৃথিবীতে সম্প্রসারণ করেছিল উপনিবেশ তৈরির মাধ্যমে। কিন্তু রাজতন্ত্রের ঐতিহ্যের নিরিখে জাপান সম্রাটদের বংশধারা ব্রিটিশ রাজপরিবারের চেয়ে প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরোনো।
বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ধারাবাহিক রাজতন্ত্র হিসেবে জাপানের নাম উল্লেখ করা হয়। ধারণা করা হয়, জাপান সম্রাটের বংশধারা ২ হাজার ৬০০ বছরের বেশি পুরোনো। দেশটির রাজতন্ত্র কখনো পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি—এটাই এর বিশেষত্ব। জাপানের বর্তমান সম্রাটের নাম নারুহিতো। তিনি দেশটির ১২৬তম সম্রাট হিসেবে ক্রাইস্যান্থেমাম সিংহাসনে আরোহণ করেন ২০১৯ সালের ১ মে। নারুহিতো তাঁর বাবা সম্রাট আকিহিতোর কাছ থেকে সিংহাসনের উত্তরাধিকার পান।
যুক্তরাজ্য
সম্ভবত পৃথিবীর বেশি পরিচিত রাজপরিবার যুক্তরাজ্যের। আমাদের দেশও একসময় তাদের রাজ্যের অংশ ছিল। এই দেশ একসময় গ্রেট ব্রিটেন বা শুধু ব্রিটেন নামে পরিচিত ছিল। সেই সূত্রে সে দেশের মানুষ আমাদের দেশে পরিচিত ছিল ব্রিটিশ হিসেবে। এ দেশের রানি ভিক্টোরিয়ার নামেই শুরু হয়েছিল ভিক্টোরিয়ান যুগের। তার ছাপ আছে আমাদের দেশের স্থাপনা, চিত্রকর্মসহ বিভিন্ন মাধ্যমে।
যাহোক, যুক্তরাজ্য এখন আর পূর্ণ রাজতান্ত্রিক দেশ নয়, সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের দেশ। এ দেশের রাজা চার্লস তৃতীয়। বলা হয়ে থাকে, এ রাজপরিবারের ঐতিহ্য প্রায় হাজার বছরের পুরোনো।
ডেনমার্ক
ইউরোপের অন্যতম প্রাচীন রাজপরিবার আছে ডেনমার্কে। এই রাজতন্ত্রের ইতিহাস শুরু হয় দশম শতক থেকে। ফ্রেডরিক দশম বর্তমানে এ দেশের রাজা। রাজা থাকলেও দেশটি আসলে সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে বিশ্বাস করে। ডেনমার্ক অত্যন্ত ধনী এবং আধুনিক একটি দেশ। এ দেশের নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান ইউরোপে সেরা। এটি ইউরোপের সবচেয়ে প্রাচীন ও ব্যাপক সমাজকল্যাণমূলক রাষ্ট্রগুলোর একটি।
ধারণা করা হয়, ভাইকিংরা এগারো শ বছর আগে ডেনীয় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। রাজতন্ত্রের ইতিহাসে ডেনমার্ক ইউরোপের দীর্ঘস্থায়ী রাজ্যগুলোর একটি।
কোন কোন দেশে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হয়েছে
বিশ্বের প্রায় সব দেশে একসময় রাজতন্ত্র ছিল। অর্থাৎ রাজারা রাজ্য তথা দেশ চালাতেন। কিন্তু পরে প্রায় পুরো পৃথিবীতে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হয়ে প্রজাতন্ত্র বা রিপাবলিকে রূপ নেয়। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ—
ফ্রান্স: ১৭৮৯ থেকে ১৭৯৯ সাল পর্যন্ত চলা ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে দেশটিতে রাজতন্ত্রের বিলুপ্তি ঘটে। সে সময় দেশটির রাজা ষোড়শ লুইকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এ ঘটনা ছিল ইউরোপসহ পশ্চিমা সভ্যতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
রাশিয়া: ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পর দেশটিতে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে। এ ঘটনা ছিল বিশ শতকের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ঘটনা। সেই বিপ্লবে রাশিয়ার জার নিকোলাস দ্বিতীয় নিহত হন।
চীন: ১৯১১ সালে সংঘটিত সিনহাই বিপ্লবের মাধ্যমে চীনে সাম্রাজ্যভিত্তিক শাসনের পতন ঘটে এবং ১৯১২ সালের ১ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময় চীনে ছিল ২ হাজার ১৩২ বছরের পুরোনো সাম্রাজ্যের শাসন। দেশটির শেষ সম্রাটের নাম ছিল পুয়ি এবং তিনি যখন পদত্যাগ করেন, সে সময় তাঁর বয়স ছিল ছয় বছর।
জার্মানি: প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয় এবং সেই সূত্রে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের কারণে জার্মানিতে শুরু হয় গণ-অভ্যুত্থান। এর কারণে ১৯১৮ সালের ৯ নভেম্বর জার্মানিতে ৪৭১ বছরের হোহেনজোলারন রাজবংশের অবসান ঘটে। কাইজার উইলিয়াম ২ নেদারল্যান্ডসে নির্বাসিত হলে জার্মানিতে ভাইমার রিপাবলিক বা প্রজাতন্ত্র ঘোষিত হয়।
ইতালি: কোনো আন্দোলনের মাধ্যমে নয়; বরং ১৯৪৬ সালের ২ জুন একটি ঐতিহাসিক গণভোটের মাধ্যমে ইতালিতে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়, ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান এবং রাজপরিবারের ভূমিকার প্রতি জন-অসন্তোষের কারণে ইতালীয়রা গণভোট আয়োজন করে আনুষ্ঠানিকভাবে স্যাভয় রাজবংশকে বিদায় জানায়। এর মাধ্যমে ১৮৬১ সাল থেকে চলে আসা ইতালীয় রাজত্বের অবসান ঘটে।
ইরান: ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানের আড়াই হাজার বছরের রাজতান্ত্রিক ইতিহাসের অবসান ঘটে। সে সময় দেশটিতে ছিল পাহলভি রাজবংশের শাসন। শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি ছিলেন সে সময়ের রাজা। তাঁর স্বৈরাচারী শাসন, পাশ্চাত্য নির্ভরতা, তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দমনপীড়নের বিরুদ্ধে গণজাগরণ ঘটে যায়। ফলে আয়াতুল্লাহ আলী খোমেনির নেতৃত্বে ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের দিকে পা বাড়ায়।
ইথিওপিয়া: শেবার বিখ্যাত রানি এবং রাজা সলোমনের গল্পখ্যাত দেশ ইথিওপিয়ায় রাজতন্ত্রের ইতিহাস বহু প্রাচীন। এ দেশে খ্রিষ্টপূর্ব ৭ অব্দে রাজতন্ত্রের ইতিহাস পাওয়া যায়। এই দীর্ঘ সময়ে দেশটিতে রাজত্ব করেন বিভিন্ন বংশের রাজারা। বিশ শতকের শেষ দিকে এসে তার সমাপ্তি হয়। ১৯৭৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশটির শেষ সম্রাট হাইল সেলাসি ক্ষমতা ত্যাগ করেন তাঁরই সেনাবাহিনীর কাছে।
নেপাল: আমাদের একেবারে কাছের দেশ নেপাল। হিমালয় কন্যা হিসেবে এর পরিচিতি। ভারতীয় উপমহাদেশের এই দেশে ছিল প্রাচীন রাজতন্ত্রের ঐতিহ্য। তবে মাওবাদী বিদ্রোহের কারণে ২০০৮ সালের ২৮ মে দীর্ঘ ২৪০ বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে নেপালে। এর পর থেকে দেশটি ফেডারেল ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক বা প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। নেপালের শেষ রাজা ছিলেন জ্ঞানেন্দ্র শাহ।
এই দেশগুলো ছাড়া আরও অনেক দেশ; যেমন গ্রিস, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, আফগানিস্তান ইত্যাদি বিভিন্ন সময়ে রাজতন্ত্র থেকে সরে এসেছে।

উজ্জ্বল বাংলাদেশ ডেস্ক