কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান ও সহকারী শিক্ষকদের শ্রান্তি বিনোদন ভাতা বণ্টনে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এতে শিক্ষক সমাজের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নার্গিস ফাতিমা তোকদারের নেতৃত্বে উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান এবং শিক্ষা অফিসের সদ্য সাবেক অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক হাবিবুর রহমানের সহায়তায় ভাতা বণ্টনের নামে অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। অভিযোগে স্বজনপ্রীতি, ঘুষ গ্রহণ, অর্থ আত্মসাত ও স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়টি উঠে এসেছে।
জানা গেছে, বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে কয়েকজন শিক্ষক প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, ডিভিশনাল কন্ট্রোলার অব অ্যাকাউন্টসসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই শিক্ষক সমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে প্রায় এক কোটি টাকা শ্রান্তি বিনোদন ভাতা বরাদ্দ পেলেও তা যথাযথভাবে শিক্ষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়নি। বরং অর্থের একটি অংশ ফেরত পাঠানো হয় মন্ত্রণালয়ে।
পরবর্তীতে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে পুনরায় প্রায় একই পরিমাণ বরাদ্দ এলে তা বণ্টনের ক্ষেত্রে অসংগতি ও অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, কোনো শিক্ষককে মূল বেতনের চেয়ে বেশি, কাউকে কম এবং কাউকে একই ভাতা দুইবার দেখিয়ে অর্থ প্রদান করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, গত ৪ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে একই স্মারক নম্বর (১০০১) ব্যবহার করে ২৬৮ জন শিক্ষকের জন্য ৬২ লাখ ১১ হাজার ১৬০ টাকার বিল পাস করিয়ে সোনালী ব্যাংক (পিএলসি), উলিপুর শাখায় পাঠানো হয়। একই তারিখে ১০০২ নম্বর স্মারকে ৩৭ জন শিক্ষকের জন্য ৮ লাখ ৩ হাজার ৯৮০ টাকার বিল করা হলেও সংশ্লিষ্ট নথি অদৃশ্য রয়েছে।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, পশ্চিম নাওড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আলমগীর হোসেনকে ২০ হাজার ৪২০ টাকা করে দুইবার ভাতা প্রদান করা হয়েছে। হারুনেফরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রওশন আক্তারকে তিন বছর পূর্ণ না হওয়া সত্ত্বেও ২০ হাজার ৮১০ টাকা প্রদান করা হয়েছে, যা তার মূল বেতনের তুলনায় ১ হাজার ৪৪০ টাকা কম।
এছাড়া, উপজেলা শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারী হাবিবুর রহমানের স্ত্রী হোকডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আইরিন বেগমসহ ১৬ জন শিক্ষককে প্রাপ্যতার চেয়ে বেশি ভাতা প্রদান করা হয়েছে।
অপরদিকে, সাতদরগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নাছিমা আফরোজসহ ১২ জন শিক্ষককে মূল বেতনের চেয়ে কম ভাতা দেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক বলেন, একই তারিখ ও স্মারক নম্বর ব্যবহার করে দ্বৈত বিল পাস করা রহস্যজনক এবং এতে অর্থ আত্মসাতের আশঙ্কা রয়েছে। তারা আরও জানান, প্রাপ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক শিক্ষক এই ভাতা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান বলেন, ‘উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নার্গিস ফাতিমা তোকদার হলেন এই বিষয়ের আয়ন ও ব্যয়ন কর্মকর্তা তিনি সকল দায়-দায়িত্ব বহন করেছেন।’
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নার্গিস ফাতিমা তোকদার বলেন, ‘ভুলবশত কোনো শিক্ষককে বেশি বা দ্বৈত ভাতা প্রদান হয়ে থাকলে ট্রেজারির মাধ্যমে তা ফেরত নেওয়া হবে। আর যাদের কম দেওয়া হয়েছে, তাদের সমন্বয় করে দেওয়া হবে।’
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা স্বপন কুমার রায় চৌধুরী বলেন, ভাতা বণ্টনে অনিয়ম হয়ে থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রুহুল আমিন রুকু, কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধিঃ