প্রিন্ট এর তারিখঃ বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৯ মাঘ ১৪৩২

১২ ফেব্রুয়ারির গণভোট: “বাঙালি” নয়, “বাংলাদেশি” পরিচয়

সম্পাদকীয়

গণভোটকে ঘিরে বড় একটা বিভ্রান্তি হচ্ছে—ব্যালটে ৪টি সংক্ষিপ্ত বিষয় থাকলেও এর ভেতরে “জুলাই জাতীয় সনদ”-এর ৮৪টি সুপারিশ/প্রস্তাব যুক্ত আছে—এ কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। 
এখন ১ নম্বর আলোচ্য বিষয়টি—পরিচয়: “বাঙালি” থেকে “বাংলাদেশি”। বাংলা ট্রিবিউনের ব্যাখ্যায় এটি জুলাই সনদে উল্লেখ আছে এবং ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে তা কার্যকর করার কথা বলা হচ্ছে। 
১) “বাঙালি” বনাম “বাংলাদেশি”—দুটি আলাদা স্তর
• বাংলাদেশি = রাষ্ট্রীয়/আইনি পরিচয় (নাগরিকত্ব, পাসপোর্ট, ভোটাধিকার)
• বাঙালি = ভাষা-সংস্কৃতি-ঐতিহাসিক পরিচয় (বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার)
সমস্যা হয় যখন রাজনৈতিক ভাষ্যে “বাংলাদেশি”কে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে “বাঙালি”কে বাতিল/অপ্রয়োজনীয় হিসেবে দাঁড় করানো হয়—এটা পরিচয়ের স্বাভাবিক সহাবস্থানের বদলে একটি পরিচয়কে সরিয়ে আরেকটি বসানোর দিকে যায়।
২) কেন এই প্রস্তাব আসতে পারে—সম্ভাব্য উদ্দেশ্য (নিরপেক্ষভাবে)
এ ধরনের পরিচয়-শিফট সাধারণত ৩টি কারণে সামনে আসে—
1. রাষ্ট্রকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদ জোরদার করা (এক ছাতার নিচে সবাইকে “বাংলাদেশি” হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা)
2. ভাষা/সংস্কৃতিভিত্তিক রাজনীতির প্রভাব কমানো
3. সংবিধানের “মূলনীতি” ও জাতীয় বয়ানকে পুনর্গঠন করা (বাংলা ট্রিবিউনে বলা হয়েছে—মূলনীতির ভাষ্য বদলানোর প্রস্তাবও আলোচনায় আছে)। 
উদ্দেশ্য “ঐক্য” হতে পারে—কিন্তু বাস্তবায়নের ধরনই ঠিক করবে ফলাফল “ঐক্য” হবে, নাকি “বিভাজন”।
৩) ‘হ্যাঁ’ হলে সম্ভাব্য বাস্তব পরিণতি কী হতে পারে?
ক) সংবিধান/রাষ্ট্রীয় নীতিতে ভাষার পরিবর্তন
পরিচয় বদল মানে শুধু শব্দ বদল নয়—এটা রাষ্ট্রের অফিসিয়াল ভাষ্য বদলায়:
• পাঠ্যক্রম, সরকারি দলিল, রাষ্ট্রীয় দিবসের বয়ান, সাংস্কৃতিক নীতিমালা—সবকিছুতে প্রভাব পড়ে।
খ) ইতিহাস ব্যাখ্যার ‘স্লাইডিং’ ঝুঁকি
আজ “পরিচয়” বদল, কাল ইতিহাসের কিছু অধ্যায়কে “কম কেন্দ্রীয়” হিসেবে দেখানোর প্রবণতা—এটা দূর ভবিষ্যতে ঐতিহাসিক স্মৃতির ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। (এটাই দূরদর্শী চিন্তার জায়গা: পরিবর্তনটা কোথায় থামবে?)
গ) সংখ্যালঘু/ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে সুযোগও আছে—ঝুঁকিও আছে
রাষ্ট্রীয়ভাবে সবাই “বাংলাদেশি”—এটা ইতিবাচক।
কিন্তু যদি “জাতিগত/ভাষাগত বহুত্ব”কে স্বীকৃতি না দিয়ে একমাত্রিক পরিচয় চাপানো হয়, তাহলে উল্টো করে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সংকুচিত হতে পারে।
৪) ‘না’ হলে সম্ভাব্য পরিণতি কী?
• বর্তমান পরিচয়-ভাষ্য বজায় থাকবে, কিন্তু
• যেহেতু গণভোটকে ঘিরে “কী আছে/কী বদলাবে” তা নিয়ে জনমনে ধোঁয়াশা আছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ, ‘না’ ফল এলে রাজনৈতিকভাবে আরও পোলারাইজেশন/দোষারোপ বাড়তে পারে। 
৫) ভোট দেওয়ার আগে বাস্তবসম্মত ৩টি প্রশ্ন (নিজেকে করুন)
1. “বাংলাদেশি” পরিচয়কে শক্ত করতে গিয়ে কি “বাঙালি” পরিচয়কে মুছতে বলা হচ্ছে—নাকি সহাবস্থান থাকবে?
2. পরিবর্তনটা কি মানুষের অধিকার/গভর্ন্যান্স উন্নত করবে, নাকি শুধু বয়ানের রাজনীতি হবে?
3. এই পরিবর্তনের রক্ষাকবচ কী—যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকার পরিচয়-ভাষ্যকে অপব্যবহার করে কারও সংস্কৃতি/ভাষা-অধিকার সংকুচিত করতে না পারে?
শেষ কথা
গণতন্ত্রে সম্মতি তখনই অর্থবহ, যখন তা বোঝাপড়ার ওপর দাঁড়ায়—আর তাই “প্রশ্ন তোলা” কোনো অপরাধ না; বরং দায়িত্বশীল নাগরিকত্ব। 

প্রতিষ্ঠাতা, ক্যাপশন নিউজ এবং ভিডিও এডিটরঃ মো: রাজিবুল করিম রোমিও, এম, এস, এস (সমাজ কর্ম-রাজশাহী), প্রধান উপদেষ্টাঃ মো: সাদেকুল ইসলাম (কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সংগঠক), উপদেষ্টাঃ মো: মাহিদুল হাসান সরকার, প্রকাশকঃ কামরুন নেছা তানিয়া, সম্পাদকঃ মো: আ: হান্নান মিলন, সহকারী সম্পাদকঃ রুবিনা শেখ, ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: আব্দুল আজিজ, বার্তা সম্পাদকঃ মো: মিজানুর সরকার

প্রিন্ট করুন