সুফি দর্শনের আলোকে জিবরাঈল (আ.)-এর আগমন এবং তৎকালীন আধ্যাত্মিক অবস্থা অত্যন্ত নিগূঢ়। সুফি সাধক ও আরিফগণ (জ্ঞানতাপস) এই মুহূর্তটিকে যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, তার মূল দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. প্রশান্ত আত্মা ও ওহীর আলোকপাত
মেরাজের রাতে নবীজি (সা.) উম্মে হানির ঘরে তন্দ্রাচ্ছন্ন বা ঘুমের ঘোরে ছিলেন। সুফি তত্ত্বে একে বলা হয় ‘আলমে মেছাল’ বা আধ্যাত্মিক জগতের সঙ্গে সংযোগের এক বিশেষ অবস্থা। জিবরাঈল (আ.) যখন সেখানে উপস্থিত হন, তখন পুরো ঘরটি নূরে নূরান্বিত হয়ে যায়। সুফিগণ বলেন, এটি ছিল মূলত নবীজির হৃদয়ের নূর এবং জিবরাঈল (আ.)-এর নূরের এক মহামিলন। উম্মে হানির ঘরটি তখন আর সাধারণ কোনো কক্ষ ছিল না, বরং সেটি ‘আরশে মুয়াল্লার’ একটি প্রতিচ্ছবিতে পরিণত হয়েছিল।
২. ছাদ বিদীর্ণ হওয়ার আধ্যাত্মিক রহস্য
বর্ণিত আছে যে, জিবরাঈল (আ.) ঘরের ছাদ বিদীর্ণ করে প্রবেশ করেছিলেন।
সুফি ব্যাখ্যা: এখানে ‘ছাদ বিদীর্ণ’ হওয়া একটি প্রতীকী তাৎপর্য বহন করে। এটি নির্দেশ করে যে, যখন উচ্চতর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা (মেরাজ) ঘটে, তখন মানুষের পার্থিব সীমাবদ্ধতা বা ‘জাগতিক ছাদ’ ভেঙে যায়। উম্মে হানির ঘরের সেই মুহূর্তটি ছিল বস্তুজগৎ (আলমে নাসুত) থেকে আধ্যাত্মিক জগতের (আলমে মালাকুত) দ্বার উন্মোচনের ক্ষণ।
৩. বক্ষ বিদারণ (শাক্কুস সদর) এবং পবিত্রতা
উম্মে হানির ঘর থেকে নবীজিকে হাতিমে কাবায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে আবারও তাঁর বক্ষ বিদারণ করা হয়। সুফি দর্শনে এর গভীর অর্থ হলো—মহান আল্লাহর দিদার বা দর্শনের জন্য মানুষের হূদয়কে কেবল সাধারণ পবিত্র নয়, বরং ‘নূরে ইমান’ এবং ‘হেকমত’ (প্রজ্ঞা) দিয়ে পূর্ণ করতে হয়। উম্মে হানির ঘরের সেই আধ্যাত্মিক পরিবেশে নবীজিকে এই চূড়ান্ত ভ্রমণের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল।
৪. উম্মে হানির নীরব সাক্ষী হওয়া
তৎকালীন সেই মহাজাগতিক ও আধ্যাত্মিক আলোড়নের সময় উম্মে হানি (রা.) সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সুফিগণ মনে করেন, যদিও উম্মে হানি শারীরিকভাবে মেরাজে যাননি, কিন্তু সেই নূরের তাজাল্লি (প্রতিফলন) তাঁর আত্মাকেও স্পর্শ করেছিল। এ কারণেই তিনি নবীজির ফিরে আসার পর তৎক্ষণাৎ বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন এবং নবীজির প্রতি গভীর মমতা ও আশঙ্কাবোধ করেছিলেন। এটি ছিল ‘বেলায়েত’ বা আধ্যাত্মিক নৈকট্যের এক অনন্য প্রকাশ।
৫. জামালি ও জালালি সিফাতের সংমিশ্রণ
সুফি তত্ত্বে আল্লাহর দুটি বিশেষ গুণ আছে—’জামাল’ (সৌন্দর্য/করুণা) এবং ‘জালাল’ (মহিমা/প্রতাপ)।
উম্মে হানির ঘরটি ছিল ‘জামাল’ বা পরম প্রশান্তির প্রতীক।
আর মেরাজের যাত্রা ছিল আল্লাহর ‘জালাল’ বা মহিমা প্রত্যক্ষ করার সফর। জিবরাঈল (আ.)-এর আগমনের মাধ্যমে সেই রাতে উম্মে হানির ঘরে এই দুই গুণের এক অপূর্ব মিলন ঘটেছিল।
উপসংহার: সুফিবাদের মরমী দৃষ্টিতে, উম্মে হানির ঘরে জিবরাঈল (আ.)-এর আগমন ছিল এমন এক মুহূর্ত যখন পার্থিব সময় থমকে গিয়েছিল। সেটি ছিল সসীম থেকে অসীমের দিকে যাত্রার সন্ধিক্ষণ। উম্মে হানি (রা.) সেই আধ্যাত্মিক রূপান্তরের প্রধান সাক্ষী এবং তাঁর ঘরটি ছিল ‘নবুওয়াতের সূর্য’ উদিত হওয়ার পূর্ব মুহূর্তের পবিত্র আকাশ।

উজ্জ্বল বাংলাদেশ ডেস্ক