প্রিন্ট এর তারিখঃ রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬, ১৪ চৈত্র ১৪৩২

স্মৃতির নীলাঞ্জনা

এস এম শিমুল (লেখক ও ফিচার কলামিস্ট)

প্রকৃতির এক নিপুণ কারুকার্য এই কুয়াকাটা, যেখানে বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি আর পলিমাটির সুগন্ধ মাখা সৈকত মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। একে আমরা ভালোবেসে ডাকি ‘সাগর কন্যা’। এই ভূখণ্ডের বিশেষত্ব কেবল তার আঠারো কিলোমিটার দীর্ঘ বালুকাময় তটে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে এক অলৌকিক দৃশ্যকাব্য। পৃথিবীর খুব কম সৈকতই আছে যেখানে দাঁড়িয়ে মানুষ ভোরের প্রথম সূর্যকে উদিত হতে দেখে আবার সেই একই দিগন্তে দিনের শেষ আলোকে বিলীন হতে দেখার সাক্ষী থাকে। আমার লেখক জীবনের ব্যস্ত চোরাবালিতে যখনই হাঁপিয়ে উঠেছি, তখনই সাগর কন্যা আমাকে তার লোনা বাতাসের মন্ত্রে দুবার ডেকে নিয়েছে। সেই ডাক উপেক্ষা করার সাধ্য কোনো শব্দচাষীর নেই।
​কুয়াকাটার আসল জাদুকরী রূপ দেখা যায় ভোরের আলো ফোটার আগে। গোধূলি আর উষার সন্ধিক্ষণে এখানে যে অলৌকিক দৃশ্য তৈরি হয়, তা কোনো দক্ষ চিত্রশিল্পীর তুলিতেও আঁকা অসম্ভব। সৈকতের বালুরাশিতে হাজার হাজার লাল কাঁকড়ার লুকোচুরি খেলা দেখে মনে হয়, প্রকৃতি যেন লাল রঙের আলপনা এঁকে ভ্রমণার্থীদের স্বাগত জানাচ্ছে। একটু ভেতরে গেলেই দেখা মেলে গঙ্গামতির জঙ্গল, যেখানে ম্যানগ্রোভ বনের নিবিড় ছায়া আর বন্য পরিবেশ মানুষের যান্ত্রিক ক্লান্তি ধুয়ে দেয়। এই জনপদের মানুষের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতিও অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। রাখাইনদের জীবনধারা, তাদের হাতে বোনা তাঁতের কাপড় আর মিশ্রিপাড়ার বিশাল বৌদ্ধ মন্দির পর্যটকদের মনে এক আধ্যাত্মিক প্রশান্তি এনে দেয়।
​আমার সেই দুইবারের কুয়াকাটা ভ্রমণ কেবল পর্যটন ছিল না, ছিল হৃদয়ের গহীনে জমানো কিছু অব্যক্ত শব্দের মুক্তি। স্মৃতির পাতায় অমলিন হয়ে আছে ‘হোটেল নীলাঞ্জনা’। সেখানে কাটানো সেই দুটি রাত আমার লেখক জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নির্জন সময়। হোটেলের জানালার কপাট খুললেই লোনা বাতাসের ঝাপটা আর সমুদ্রের গর্জন হৃদয়ে নাড়া দিয়ে যেত। রাতের নিস্তব্ধতায় যখন চারপাশ নিঝুম হয়ে যেত, তখন নীলাঞ্জনার সেই ছায়াঘেরা পরিবেশে বসে আকাশের অগুনতি নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে আমি আমার সাহিত্যের প্লট সাজিয়েছি। সেই দুটি রাত ছিল যেন পূর্ণিমার আলোয় ধোয়া এক একটি স্বপ্নের প্রহর। সমুদ্রের নোনা গন্ধে আর নীলাঞ্জনার স্নিগ্ধ আতিথেয়তায় নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম এক অদ্ভুত ভালো লাগার ঘোরে।
​কুয়াকাটা এখন আধুনিক পর্যটকদের জন্য অনেক বেশি সমৃদ্ধ। আন্তর্জাতিক মানের সিকদার রিসোর্ট অ্যান্ড ভিলাস, হোটেল কুয়াকাটা গ্র্যান্ড কিংবা হোটেল গ্রেভার ইনের মতো বিলাসবহুল আবাসস্থলগুলো পর্যটকদের যেমন আরামদায়ক পরিবেশ দেয়, তেমনি সরকারি পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সটি আস্থার এক অনন্য নাম। ভ্রমণার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য এখানে সবসময় ট্যুরিস্ট পুলিশ তৎপর থাকে, যা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের নির্ভয়ে বিচরণের সুযোগ করে দেয়। সৈকতে স্পিডবোট রাইডিং, সাইক্লিং কিংবা ফিশ মার্কেটে বসে টাটকা মাছ ভাজার স্বাদ নেওয়া—সব মিলিয়ে এক পূর্ণাঙ্গ বিনোদনের পসরা সাজিয়ে বসে আছে এই সাগর কন্যা।
​প্রথমবার যখন কুয়াকাটা গিয়েছিলাম, তখন সে ছিল আমার কাছে এক অচেনা কিশোরীর মতো রহস্যময়ী। আর দ্বিতীয়বারের যাত্রা ছিল যেন কোনো পুরনো প্রেমিকার কাছে ফিরে যাওয়া। নীল জলরাশির বুকে যখন সূর্যের রক্তিম আভা আছড়ে পড়ত, তখন আমার ডায়েরির পাতাগুলো নিজে থেকেই ভরে উঠত শব্দের মিছিলে। সাগর কন্যা কুয়াকাটা কেবল একটি ভূখণ্ড নয়, এটি একটি অনুভূতি। এর বালুকণা আর রাখাইন পল্লীর বাঁশির সুর মিলে এক অখণ্ড কবিতা তৈরি করে। হোটেল নীলাঞ্জনার সেই স্মারক মুহূর্তগুলো আমার চেতনার ক্যানভাসে আজও রঙিন হয়ে আছে। এই পাণ্ডুলিপি আসলে সেই লোনা জল আর জোছনায় ভেজা মুহূর্তগুলোরই এক সাহিত্যিক সংকলন।

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ সাদেকুল ইসলাম (কবি, সাহিত্যিক, সংগঠক), উপদেষ্টাঃ মোঃ মাহিদুল হাসান সরকার, উপদেষ্টাঃ মোঃ আঃ হান্নান মিলন, প্রকাশকঃ কামরুন নেছা তানিয়া, সম্পাদকঃ রাজিবুল করিম রোমিও-এম, এস, এস (সমাজ কর্ম), নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসাইন, ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুল আজিজ, সহ-ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ খন্দকার আউয়াল ভাসানী, বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ মিজানুর সরকার

প্রিন্ট করুন