বাংলার লোককবি জরিনা সুন্দরী কবিতায় রুপ বর্ণনায় বলেছেন-‘ জরিনার বয়স ষোল/ হাতে ছিলো প্লাস্টিকের চুড়ি/ গলায় ছিলো পূঁতির মালা/ পড়নে লাল শাড়ি/ বরণ কাঁচা সোনা’…
নবীন দাস বাউলও তাঁর মনের মানুষ কে রুপসাগরে ‘কাঁচাসোনা’ হিসেবেই দেখেছেন।
কিন্তু সেই কাঁচাসোনা বরণ কী? সে কথার উত্তর দিয়েছেন আমাদের আরেক লোককবি সিরাজুল ইসলাম এভাবে-‘ হলুদিয়া পাখি/সোনারই বরণ/পাখিটি ছাড়িল কে’..।
হ্যা, হলুদ বরণই কাঁচাসোনার প্রকৃত রুপ। সেই কাঁচাসোনার চাদরে ঢাকা এখন চলনবিলের বিস্তৃর্ণ অঞ্চল। বলছিলাম সরিষা ফুলের মোহনীয় রুপের কথা। আপনি যদি এই শীতে চলনবিলে আসেন, যতদুর দৃষ্টি যায় দেখতে পারবেন হলুদে মাখানো সোনার বরণের সরিষা ফুলের অপরুপ সৌন্দর্য। যেনো কোনো এক নিপুণ শিল্পী ক্যানভাসজুড়ে এঁকেছেন স্বর্ণের নান্দনিক ধ্রুপদী চিত্রকর্ম। সেখানে মাঠের পর মাঠ ফুঁটে উঠেছে শীত ভোরে সর্ষের ফুল থেকে ঝড়ে পড়া শিশির বিন্দুর হিরন্ময় দ্যূতি, রৌদ্রাজ্জ্বল দুপুরে সর্ষে ফুলের শীর্ষে মধূ আহরণে মৌমাছির গুঞ্জরণ; শেষ বিকেলে অস্তাচলে রবির সোনালী আভায় একাকার।
সে ছবি থেকে সত্যি চোখ ফেরানো দায়। এ সৌন্দর্য দেখে আপনি হয়তো অস্ফুটোস্বরে গেয়ে উঠবেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী গান-‘একি অপরুপ রুপে মা তোমার হেরিনু পল্লী জননী…।
অথচ মাত্র দেড় দশক আগেও কিন্তু সিরাজগঞ্জ,পাবনা,নাটোর ও নওগাঁ জেলার ৩৬ টি উপজেলা নিয়ে গঠিত চলনবিল ছিলো এক ফসলী।
বৈশ্বিক জলবায়ুর পরিবর্তন, উজানে বাঁধের কারণে কল কল ছল ছল শব্দে বয়ে চলা ৪৭ টি নদনদী এখন বিশুষ্ক-জীর্ণশীর্ণ।
দেশের উত্তাঞ্চলের মরুকরণ প্রক্রিয়ার প্রভাব আজ চলনবিলেও পরতে শুরু করেছে। বিলের প্রাণ-প্রকৃতি,পরিবেশ ও অর্থনীতি মারাত্মক হুমকির সম্মুখিন। এ বিলের একদিকে পদ্মা অন্য দিকে যমুনা। বর্ষাকালে এই দুই বড় নদীর পানি আত্রাই, বড়াল,গুমানী সহ বিভিন্ন নদী ও খালের মাধ্যমে সঞ্চিত হওয়ায় বন্যার প্রকোপ হ্রাস পায়। শীতেকালে চলনবিলের পানি নদী সমূহে গড়ায় এবং এগুলোর প্রবাহ বৃদ্ধি করে।
চলনবিল রক্ষা আন্দোলনের মহাসচিব মিজানুর রহমান তাঁর এক গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেছেন, চলনবিলের অভ্যান্তরে রয়েছে-৪৭ টি নদী,১৬৩ টি বিল, ৩০০ টির বেশি খাল, এক লাখ ২০ হাজার পুকুর এবং কয়েকটি বড় বড় পাথার। এখানে রয়েছে ১০৫ প্রজাতির দেশী মাছ,৩৪ প্রজাতির সরীরসৃপ,২৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, সাত প্রকারের উভচর প্রাণী,৩৪ প্রজাতির পাখি,অসংখ্য প্রকারের জলজ ও স্থলজ উদ্ভিদ এবং জলজ প্রাণীর উপস্থিত সহ জীববৈচিত্রময় বাংলাদেশের এক অমূল্য সম্পদ।
এ বিল থেকে নানা কারণে হারিয়ে গেছে গজার,ধোদা,খরসুলা,চ্যাকা,বাচা,গুজা ইত্যাদি মাছ। ভাতসোলা, জলকলা, গেচু, মাখনা, হোগলা,চেচুর সহ বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ. শৈবাল, মস,ফার্ণ ইত্যাদিও আজ বিলুপ্ত।
প্রকৃতির বৈপরীত্যে বিলের মানুষ তার পেশা বদল করছেন। একালের জেলে মাঝি এখন ভ্যান চালক অথবা দিন মজুর। হালদাররা আর মাছ ধরার পেশায় নেই, নেই কামার কুমার, চুনিয়া,মালাকারের সন্তানেরা নিজ নিজ পেশায়। শত শত বছর ধরে গড়ে ওঠা এসব পেশা আধুনিক মনন ও জীকিবার তাগিদে বদলাতেই হচ্ছে।
পাল্টে গেছে ফসলেরও চিরায়ত শৃঙ্খলা। বিল থেকে হারিয়ে গেছে বোনা আমনের অসংখ্য জাত। গত শতাব্দীর আশির দশকেও এ বিলে রবি ও খরিফ মৌসুমে কাউন, তিল,তিশি, ছোলা,খেসারি ও গম পর্যাপ্ত ফলতো। এরপর আসে উচ্চ ফলনশীল বোরো ধান। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বর্ষায় বিলে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় বোরো মৌসুমের আগেই মাঠ শুকিয়ে যাওয়ায়, বোনাস ফসল হিসেবে কৃষক চাষ শুরু করেন সরিষা,ভুট্রা ও রসূণের আবাদ। যা চলনবিলের কৃষকের ঘরে এখন অর্থনীতির নতুন এক মাত্রা যোগ করেছে।
এ সরিষার তেল দেশের আমদানী নির্ভর ভোজ্য তেলের উপরও চাপ কমায়। এর খৈল মৎস্য ও পশুখাদ্যে অনেকাংশে ভূমিকা রাখে।
সরিষা ফুল থেকে মৌমাছি মধূ সংগ্রহ করে। এ সময়ে বিলের অভ্যান্তরে গেলে দেখা মিলবে শত শত মৌ খামারীরা মধূ সংগ্রহের জন্য মৌ বাক্স বসিয়েছেন। এখন আর বন্য মৌমাছির মৌচাকের খুব একটা দেখা মেলে না। বন্য মৌমাছি কে মানুষ আবাসিক করে ফেলেছেন। বর্তমানে সরিষার মধূ সংগ্রহ করা হয় মৌ খামার থেকে। চলনবিলে সরিষা ফুলের মধূ কে আখ্যায়িত করা হয়৷ ‘তরল সোনা’ হিসেবে।

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্র বলছে, এ বছরে চলনবিল থেকে পাঁচ শ ৪১ টন ৩৭৬ কেজি মধূ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। নামীদামি কোম্পাণীগুলো ভিড় করছে পাইকারী দরে মধূ কিনতে। সেই সাথে অনলাইনের ব্যবসায়ীরাও আসছেন সরিষার মধূ মাঠ পর্যায় থেকে মধূ সংগ্রহ করতে। কৃষি বিভাগ জানাচ্ছে, মৌ মাছি শুধু মধুই সংগ্রহ করে না, সরিষা ফুলের পরাগায়ণেও ভূমিকা রাখে। যারফলে ১৫ থেকে ২০% ফলন বৃদ্ধি পায়। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ায় চলনবিলের তরল সোনা মধূতে- এ বছর দেখা দিয়েছে অশনিসংকেত। এ ধরনের আবহাওয়া চলমান থাকলে শত কোটি টাকার বাজার নেমে আসবে ২০ শতাংশে। লোকসান গুণতে হবে মৌখামারীদের এমনটাই জানালেন, মৌচাষি মি. সঞ্জিত কুমার।
তাড়াশ কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার জানাচ্ছে, চলতি বছরে চলনবিলের তাপমাত্রা সর্বনিম্ন ৭ ডিগ্রির ঘরে ওঠানামা করছে। শৈত্য প্রবাহের কারণে মৌখামীরা ডিসেম্বর মাসে মাত্র একবার মধূ হারভেস্ট করতে পেরেছেন। অথচ এ সময় পর্যন্ত খামারীরা তিনবার মধূ সংগ্রহ করে থাকেন। তীব্র শীতে মৌ মাছি মারা যাচ্ছে। সরিষা ফুল ভেজা থাকায়,জীবিত মৌ মাছিরা মধূ সংগ্রহ করছেনা। তার উপর কৃষক নির্বিচারে সরিষার জমিতে কীটনাশক প্রয়োগ করায় বেঘরে মৌমাছি মারা পড়ছে।
তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সেন গুপ্তা এ বিষয়ে কৃষকদের পরামর্শ দিয়েছেন, সকালে নয় বরং পড়ন্ত বিকেলে কীটনাশক প্রয়োগ করার। কেননা তখন মৌমাছিরা মৌ বাক্সে ফিরে আসে। মৌমাছিরও জীবন বাঁচে।
এই শীতে চলনবিলের ভ্রমণে আসলে, পথে প্রান্তরে চলতে চলতে লাভ লোকসান আর ভাঙাগড়ার নানা আখ্যান মনে পড়ার মাঝেও আপনাকে বিমুগ্ধ করবে, কাঁচাসোনা সরিষা ফুলের মোহনীয় রুপ। সেই সাথে মনের পড়বে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের সেই চরণ টি- ‘কী শোভা, কী ছায়া গো,কী স্নেহ ,কী মায়া গো…/ কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে।

কিভাবে আসবেন :
আপনি ঢাকা থেকে আসলে বগুড়া অথবা রংপুর গামী বাসে করে হাটিকুমরুল গোলকত্বরে, খালকুলা, মহিষলুটি মান্নাননগর অথবা কাছিকাটা বাসস্ট্যান্ডে নেমে অটোভ্যান, সিএনজি করে একদিনেই ঘুরে দেখতে তারাশ, উল্লাপাড়া ও গুরুদাসপুর উপজেলার বিভিন্ন মাঠ প্রান্তর।
থাকা ও খাওয়া:
সাধারণত: ঢাকা থেকে চলনবিলে দিন এসে দিনেই ফিরে যাওয়া যায়। থাকার জন্য সিরাজগঞ্জ শহরে জেলা পরিষদের বাংলো, বিভিন্ন আবাসিক হোটেল, উল্লাপাড়া ও তাড়াশ ডাকবাংলো অনলাইনে আগেই বুকিং করে আসতে পারেন।
খাওয়ার জন্য হাটিকুমরুল গোলকত্বের এ্যারোস্টোক্রিয়েট, ফুড ভিলেজ, স্লিল্কসিটি, খালকুলা, মহিষলুটি, মান্নাননগর ও কাছিকাটা বাসস্ট্যান্ডের বিভিন্ন হোটেলে জনপ্রিয় হাঁসের মাংস ও গরুর কালাভূনা খেতে অবশ্যই ভুলবেন না।
ভ্রমণের উপযুক্ত সময়:
চলনবিল ভ্রমণের উপযুক্ত সময় বর্ষা ও শীত কাল। বর্ষায় নৌভ্রমণ ও শীতে বাংলার টিউলিপ খ্যাত সরিষার ফুলের অপার সৌন্দর্য ও মধূ আহরণ দেখে নয়নমন কে সার্থক করে তুলতে পারেন। সেই সাথে পরিবার পরিজনের জন্য সরিষা ফুলের টাটকা মধূ সংগ্রহ করে নিয়ে যেতে পারবেন।

মুন্নি আহমেদ, তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা