বাংলায় তুর্কি বিজয়ের সর্বপ্রাচীন বিবরণ পাওয়া যায় মীনহাজুদ্দিন সিরাজ রচিত তবাকাত-ই-নাসিরী গ্রন্থে। এই গ্রন্থের উপর নির্ভর করেই বখতিয়ার খিলজি কর্তৃক মগধ ও গৌড় জয়ের প্রায় সকল প্রচলিত ধারণা গড়ে উঠেছে। কিন্তু গ্রন্থটির উৎস, রচনাকাল ও তথ্যসংগ্রহের পদ্ধতি বিচার করলে স্পষ্ট হয়—এই বিবরণ নিখুঁত সমসাময়িক ইতিহাস নয়, বরং অনেকাংশেই বহু বছর পর সংগৃহীত লোকমুখে শোনা স্মৃতিকথা।
মীনহাজুদ্দিন দিল্লির সুলতানের অধীনে উচ্চ রাজকার্যে নিযুক্ত ছিলেন এবং আনুমানিক ১২৬০ খ্রিস্টাব্দের কিছু পরে তিনি এই ইতিহাস রচনা করেন। মগধ জয়ের প্রায় চল্লিশ বছর পরে লক্ষ্মণাবতীতে তিনি দুইজন বৃদ্ধ সৈনিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, যাঁরা সেই অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের মুখে শোনা কাহিনির উপর ভিত্তি করেই তিনি মগধ জয়ের বিবরণ লিখেছেন। গৌড় বা নদীয়া অভিযানে অংশগ্রহণকারী কোনো ব্যক্তির প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎ তাঁর হয়নি; সেখানে তিনি কেবল “বিশ্বাসযোগ্য লোকদের কাছ থেকে শোনা” কাহিনির উল্লেখ করেছেন। ফলে এই বিবরণকে সম্পূর্ণ নির্ভুল ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে গ্রহণ করা যায় না, যদিও এটি আমাদের একমাত্র প্রাচীন সূত্র।
মীনহাজের বর্ণনা অনুযায়ী, মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজি প্রথমে মহম্মদ ঘোরী ও কুতবুদ্দিন আইবকের দরবারে আশ্রয় পেতে ব্যর্থ হন। পরে অযোধ্যায় মালিক হুসামুদ্দিনের অনুগ্রহে তিনি চুনারগড়ের নিকট দুইটি পরগণা জায়গির লাভ করেন। এখান থেকেই তিনি প্রায় দুই বছর ধরে মগধ অঞ্চলে লুণ্ঠন চালিয়ে ধনসম্পদ, সৈন্য ও অস্ত্র সংগ্রহ করেন। এই শক্তির উপর ভর করেই তিনি হঠাৎ আক্রমণে ‘কিল্লা বিহার’ অধিকার করেন। আক্রমণের পরেই তুর্কি সৈন্যরা বুঝতে পারে—এটি আসলে কোনো দুর্গ নয়, বরং একটি শিক্ষাকেন্দ্র, যাকে হিন্দুরা ‘বিহার’ বলে।
বিহার জয়ের পরে বখতিয়ার দিল্লিতে গিয়ে কুতবুদ্দিন আইবকের কাছ থেকে সম্মান লাভ করেন এবং ফিরে এসে সমগ্র বিহার অঞ্চলে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এই সময়ে সেনরাজ লক্ষ্মণসেন রাজধানী নদীয়ায় অবস্থান করছিলেন। মীনহাজ তাঁর জন্ম ও দীর্ঘ রাজত্ব নিয়ে এক অলৌকিক কাহিনি উল্লেখ করেছেন—যা স্পষ্টতই ঐতিহাসিকের চেয়ে কিংবদন্তির কাছাকাছি।
বখতিয়ারের বিহার জয়ের সংবাদ নদীয়ায় পৌঁছালে দৈবজ্ঞ ও ব্রাহ্মণরা শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে রাজাকে সতর্ক করেন যে তুর্কিদের হাতে এই দেশের পতন অবশ্যম্ভাবী। অনেক ব্রাহ্মণ ও বণিক নগর ত্যাগ করলেও লক্ষ্মণসেন প্রথমে রাজধানী ছাড়তে অস্বীকার করেন। পরের বছর বখতিয়ার দ্রুতগতিতে বিহার থেকে অগ্রসর হন। এই অভিযানের নাটকীয় অংশটি এখানেই—নদীয়ায় পৌঁছানোর মুহূর্তে তাঁর সঙ্গে ছিল মাত্র আঠারো জন অশ্বারোহী, বাকিরা পশ্চাতে আসছিল।
এই তথ্য থেকেই পরবর্তীকালে প্রচলিত হয়েছে—“সপ্তদশ বা আঠারো অশ্বারোহীর ভয়ে লক্ষ্মণসেন পালিয়ে গিয়েছিলেন।” কিন্তু মীনহাজের নিজের বিবরণ গভীরভাবে পড়লে এই ধারণা ভেঙে যায়। বখতিয়ার যখন রাজপ্রাসাদে পৌঁছান, তখন নগরের ভেতরে ইতিমধ্যেই তাঁর বহু সৈন্য ঢুকে পড়েছিল। শহরের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ও হত্যার শব্দ রাজপ্রাসাদে পৌঁছে গিয়েছিল। এই পরিস্থিতিতেই লক্ষ্মণসেন পশ্চাৎদ্বার দিয়ে নৌকায় পলায়ন করেন। অর্থাৎ, তিনি কেবল আঠারো জন অশ্বারোহী দেখে নয়, বরং নগরে প্রবেশ করা তুর্কি বাহিনীর বাস্তব উপস্থিতির কারণেই রাজধানী ত্যাগ করেন।
এই অভিযানে বখতিয়ার কেবল নদীয়া নগরী দখল করেন—সমগ্র গৌড় বা বাংলা এক দিনে বিজিত হয়নি। পরে তিনি ধ্বংসপ্রায় নদীয়া ত্যাগ করে লক্ষ্মণাবতীতে নতুন রাজধানী স্থাপন করেন। লক্ষ্মণসেন কিছুদিন পরে বঙ্গ অঞ্চলে তাঁর রাজ্য হারান, যদিও সেনবংশের শাসন বঙ্গদেশে আরও কিছু সময় বজায় ছিল।
সুতরাং বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয় নিয়ে প্রচলিত রোমান্টিক ও নিন্দামূলক উভয় ধারণাই তবাকাত-ই-নাসিরী-র অপাঠ্য বা একপাক্ষিক পাঠের ফল। ইতিহাস বলছে—এটি ছিল ধীরে ধীরে বিস্তারমান সামরিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, কোনো একদিনে “সোনার বাংলা” হঠাৎ হারিয়ে যাওয়ার কাহিনি নয়।

উজ্জ্বল বাংলাদেশ ডেস্ক