বহুল আলোচিত গাজীপুরের সাবেক এমপি আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামি শহিদুল ইসলাম শিপু (৫৫) গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের পার্ট-২ এ মারা গেছেন।
আজ রোববার (০৪ জানুয়ারি) বেলা ১১টা ১৫ মিনিটের দিকে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পরলে তাকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত শহিদুল ইসলাম শিপু গাজীপুর মহানগরের টঙ্গী এলাকার গোপালপুরের রফিক কন্ট্রাক্টরের ছেলে। কারা কর্তৃপক্ষ জানান, দীর্ঘদিন ধরে তিনি কারাবন্দি থাকা অবস্থায় বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগছিলেন।
কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার পার্ট-২ এর জেলার মোঃ আবুল হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, রোববার সকালে কারাগারের ভেতরে হঠাৎ করে শহিদুল ইসলাম শিপুর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে চিকিৎসা শুরুর আগেই তার মৃত্যু হয় বলে নিশ্চিত করেছেন চিকিৎসক। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন শেষে রোববার বিকেলে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এদিকে শহিদুল ইসলাম শিপুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে আত্মীয় স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীগন মর্গ ও তার নিজ বাড়িতে ভীড় জমায়। পারিবারিক সূত্র থেকে জানা যায়, সোমবার (০৫ জানুয়ারি) বেলা ১১টার সময় টঙ্গীর গোপালপুর টিএন্ডটি মাঠে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে তাকে সিটি কর্পোরেশনের গোপালপুর কবরস্থানে দাফন করা হবে।
উল্লেখ্য, ২০০৪ ইং সালের ৭ মে গাজীপুরের টঙ্গীর নোয়াগাঁও এম এ মজিদ মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলনে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন তৎকালীন আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য আহসান উল্লাহ্ মাস্টার। এ ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
ঘটনার পরদিন নিহতের ভাই মতিউর রহমান মতি একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ২০০৫ সালের ১৬ এপ্রিল ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল মামলাটিতে ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৬ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন। তবে মামলাটির তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু থেকেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ হিসেবে তৎকালীন যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতা নূরুল ইসলাম সরকার, জাতীয় ছাত্র সমাজের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম দিপু এবং তার দুই ভাই শহিদুল ইসলাম শিপু ও অহিদুল ইসলাম টিপুসহ একাধিক ব্যাক্তিকে মামলায় জড়ানো হয়।
২০১৬ সালে হাইকোর্ট এ মামলার রায়ে ৬ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন, ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন এবং ১১ জনকে খালাস দেন। বর্তমানে মামলাটি আপিল বিভাগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
এ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে বর্তমানে বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল ইসলাম সরকার এখনও কারাগারে বন্দি রয়েছেন। এবং তার পরিবার দীর্ঘদিন ধরে মামলাটি পুনরায় তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছেন।
নূরুল ইসলাম সরকারের পরিবারের অভিযোগ, কেবল শোনা কথার উপর সাক্ষ্য ও ভিত্তিহীন তথ্যের ওপর নির্ভর করে তাকে বিচারিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
তারা আরও অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ষড়যন্ত্র মূলক করা মামলাটি দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখতে বাদীপক্ষ আপিল বিভাগে একের পর এক বেঞ্চ পরিবর্তনের কৌশল গ্রহণ করে। শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বিবেচনায় ৯ম বেঞ্চে মামলাটি নিষ্পত্তি করে নূরুল ইসলাম সরকারকে কথিত ‘হুকুমের আসামি’ হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয় এবং অধিকাংশ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়।
এই প্রেক্ষাপটে কারাগারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শহিদুল ইসলাম শিপুর মৃত্যু আবারও আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলার বিচারিক স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

মোঃ মাইনুদ্দিন শিকদার স্টাফ রিপোর্টার