প্রিন্ট এর তারিখঃ শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২৬, ২১ চৈত্র ১৪৩২

লাগামহীন চিকিৎসা ব্যয়ে দিশেহারা মানুষ

ইউ বি টিভি ডেস্ক

চিকিৎসা ব্যয়ের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। সরকারি হাসপাতালের বিনামূল্যের চিকিৎসা সেবাও হয়ে উঠছে ব্যয়বহুল। আর বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যয় বহনের সামর্থ্য নেই দেশের ৮০ শতাংশ পরিবারের। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ সামলাতে গিয়ে দারিদ্র্যের ফাঁদে আটকে যাচ্ছে এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বছরে গরিব হচ্ছে দেশের প্রায় ৫০ লাখ মানুষ। দেশের স্বাস্থ্যখাতে প্রতি ১০০ টাকা ব্যয়ের মধ্যে ৭৪ টাকা বহন করতে হয় রোগীকে এবং এটি বিশ্বে সর্বোচ্চ। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলাপ করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, গ্রামের কৃষক, দিনমজুর কিংবা শহরের খেটে খাওয়া মানুষ সামান্য অসুখের চিকিৎসা করাতে গিয়েই ঋণের বোঝা কাঁধে নিচ্ছে। কেউ কেউ চিকিৎসা মাঝপথে ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে, আবার অনেকে নিম্নমানের সেবা নিচ্ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে আরও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। ক্যান্সার, কিডনি, হৃদ্রোগ কিংবা জটিল অপারেশনের মতো চিকিৎসা সাধারণ মানুষের নাগালের অনেক বাইরে চলে গেছে। বহু মানুষ চিকিৎসা না পেয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করছে, যা একটি জাতির জন্য বড় দুর্ভাগ্য।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট সমাধানে সরকারি উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দক্ষ চিকিৎসক-নার্স সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে গ্রামের মানুষ সাশ্রয়ী খরচে চিকিৎসা পায়। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বিনা মূল্যে চিকিৎসা, ওষুধে ভর্তুকি এবং স্বাস্থ্যবিমা চালু করা সময়ের দাবি। নইলে চিকিৎসা ব্যয়ের বোঝা সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও অসহনীয় করে তুলবে।

চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে বিপর্যয়ে জীবন
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের গবেষক আবদুর রাজ্জাক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য খাতে সরকারের বরাদ্দ কম হওয়ায় মানুষের ব্যক্তিগত ব্যয় বাড়ছে। ব্যয় এতটা বেড়েছে যে তা অনেক ক্ষেত্রে বিপর্যয়কর হয়ে উঠেছে। ২০২২ সালে দেশের ১৭ শতাংশ পরিবার স্বাস্থ্য ব্যয়ের কারণে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল। মূলত চিকিৎসা বাবদ মানুষের পকেট ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তানের পর বাংলাদেশের মানুষের চিকিৎসা বাবদ খরচ সবচেয়ে বেশি। ১৯৯৭ সালে যা ছিল ৫৫ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০২০ সালে ছিল ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশ; ২০২১ সালে তা ৭৩ শতাংশে উঠে যায়। স্বাস্থ্য ব্যয় এভাবে বেড়ে যাওয়ার কারণে ২০২২ সালে দেশের ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বা প্রায় ৬১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গিয়েছিলেন।

আবদুর রাজ্জাক হিসাব করে দেখিয়েছেন, যেসব পরিবারের মোট ব্যয়ের ১০ শতাংশ ভোগে ব্যয় হয়, সেই শ্রেণির ১৭ দশমিক ৭২ শতাংশ পরিবার চিকিৎসায় ব্যয় করে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। যেসব পরিবারের মোট ব্যয়ের ২৫ শতাংশ ভোগে ব্যয় হয়, তাদের ৭ দশমিক ০৭ শতাংশ চিকিৎসা ব্যয় করে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এ ছাড়া যেসব পরিবারের মোট ব্যয়ের ৪০ শতাংশ খাদ্যবহির্ভূত ব্যয় হয়, তাদের মধ্যে ৪০ শতাংশ পরিবার চিকিৎসার ব্যয় করে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২২ সালে দেশের প্রায় ৬১ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে আর্থিক চাপে পড়েছেন। তাদের মধ্যে ধার করে স্বাস্থ্য ব্যয় নির্বাহ করেছেন ২৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ মানুষ; বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়দের কাছ থেকে ধার করেছেন ১৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ আর সম্পদ বিক্রি করেছেন ১৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ। নিয়মিত আয় থেকে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় নির্বাহ করতে পেরেছেন মাত্র ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ মানুষ এবং নিজেদের সঞ্চয় থেকে ব্যয় নির্বাহ করতে পেরেছেন ৩২ দশমিক ৫৮ শতাংশ মানুষ।

গবেষণায় দেখা গেছে, হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে গড়ে একটি পরিবারের ৫৫ হাজার ১৩৪ টাকা ব্যয় হয়। হাসপাতালে ব্যয়ের সবচেয়ে বড় খাত হচ্ছে ওষুধ; এরপর আছে যথাক্রমে সার্জারির ব্যয় ২৩ শতাংশ, রোগনির্ণয়ের ব্যয় ১৭ শতাংশ, বিছানা ভাড়া ১৬ শতাংশ, অন্যান্য ১৪ শতাংশ আর চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যয় ৫ শতাংশ।

চিকিৎসা ব্যয়ে বছরে ৫০ লাখ মানুষ গরিব হচ্ছে : বিএমইউ ভিসি
চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে প্রতিবছর দেশের ৫০ লাখ মানুষ গরিব হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. শাহিনুল আলম বলেন। সম্প্রতি রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে এক অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানান তিনি।

অধ্যাপক শাহিনুল আলম বলেন, দেশের বেশিরভাগ মানুষ সুদের ওপর বা ধার করে টাকা নিয়ে চিকিৎসা করেন। পরে তাদেরকে টাকা শোধ করতে হয় নিজেদের জমি-জমা বিক্রি করতে হয়। দেশের জনসংখ্যা বিশাল। প্রচুর রোগী রয়েছে। তাই এখানে চাইলেই গবেষণা করা যায়। অনেক উন্নত দেশ আছে আধুনিক যন্ত্রপাতি আছে, কিন্তু রোগী কম। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের চিত্র আলাদা।

ভাইস চ্যান্সেলর বলেন, দেশে স্বাস্থ্যসেবা এখন এক বৃহৎ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিগত কয়েক বছরে দেশে চিকিৎসা সেবা গ্রহণকারী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে, তবে সরকারি ও বেসরকারি খাতে চিকিৎসা খরচ নিয়ে মানুষের অভিযোগের শেষ নেই। রোগীর সংখ্যা বাড়লেও চিকিৎসার খরচ কমানোর কার্যকর কোনো উদ্যোগ বা নীতির অভাব দেখা যাচ্ছে।

১০০ টাকা ব্যয়ের ৭৪ টাকা বহন করে রোগী
দেশের স্বাস্থ্য খাতে প্রতি ১০০ টাকা ব্যয়ের মধ্যে ৭৪ টাকা বহন করতে হয় রোগীকে এবং এটি বিশ্বে সর্বোচ্চ বলে মন্তব্য করেছেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ।সম্প্রতি রাজধানীতে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ হেলথ কনক্লেভ-২০২৫’- এ দেওয়া বক্তব্যে আসিফ সালেহ একথা বলেন।

ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ বলেন, ‘কোনো অসুখ হলে সেটা থেকে কীভাবে আমরা পরিত্রাণ পেতে পারি, সেজন্য সরকারি-বেসরকারি একটি সমন্বয় দরকার। সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে। কিন্তু সেটা সঠিক জায়গায় যাচ্ছে কিনা, সঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে কিনা তা ভাবতে হবে। আমাদের এ ব্যয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দ থাকে না। প্রাথমিক স্বাস্থ্য খাতে আমাদের শক্তিশালী ব্যবস্থা নেই। শহর ও গ্রামের মধ্যে একটি সমন্বয় থাকতে হবে। এর পাশাপাশি একটি মাস্টারপ্ল্যান থাকতে হবে। বিশ্বের অনেক দেশে অসাধারণ সব মডেল আছে। থাইল্যান্ড তাদের মডেল ব্যবহার করে অসাধারণ উন্নতি করেছে। সে ধরনের মডেল আমরাও ব্যবহার করতে পারি।’

বিনামূল্যের সরকারি চিকিৎসাও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে
সরকারি হাসপাতালের বিনামূল্যের চিকিৎসাসেবা হয়ে উঠছে ব্যয়বহুল! অনেক সময় পার্থক্য থাকছে না সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাব্যয়ের মধ্যে। এমন অভিযোগ তুলেছেন বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী ও তাদের অভিভাবকেরা। তারা অভিযোগ করেন, কাগজে-কলমে সরকারি হাসপাতালে নামমাত্র চিকিৎসা ফি নেওয়া হয়ে থাকে। যা সকলের জন্য সহনীয়। কিন্তু মধ্যস্বত্বভোগীদের অবৈধ আবদার মেটাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয় দরিদ্র রোগী ও তাদের স¦জনদের। চিকিৎসাসেবা গ্রহণের প্রতি পদে দেওয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র টাকার সমষ্টি হাসপাতাল থেকে বিদায়বেলার হিসেবে হয়ে উঠে পাহাড়সম। মধ্যস্বত্বভোগীদের অনিয়ম ও রোগীদের জিম্মি করে অর্থ আদায় করার কারণেই সরকারি হাসপাতালের বিনামূল্যের চিকিৎসাসেবার সুনাম হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ অনেকের।মধ্যস্বত্বভোগীদের তালিকায় তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী, আয়া, ট্রলিম্যান, ওয়ার্ড বয়সহ অনেকেই রয়েছে।

বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বিনামূল্যের চিকিৎসায় ফি দিতে হয় সরকারি হাসপাতালে। জরুরি বিভাগ থেকে রোগীশয্যা পর্যন্ত পৌঁছার চিকিৎসা ব্যয় (ট্রলিম্যান ও শয্যা যোগানদাতা) লিখিত থাকে না। শয্যায় ওঠার পর চলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার খেলা। প্রকৃতপক্ষে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রেও ফ্রি নেয়। ইউজার ফি আদায়ের নামে এখানে রোগীদের ফি প্রদানে বাধ্য করা হয়েছে। অনেক পরীক্ষা বাইরে গিয়ে করাতে হয়। রোগীকে এক জায়গা থেকে আরেকটি জায়গায় নেয়ার প্রতিবারই ট্রলিম্যানকে টাকা দিতে হয়। ওয়ার্ডবয় ও আয়াদের খুশি না করলে রোগী শয্যা ধরে রাখাটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

উচ্চমূল্যের ওষুধ এবং চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশনে লেখা কোম্পানির ওষুধ সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে পাওয়া না গেলেই রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হয়। শুধু চিকিৎসককে এবং রোগীর খাবারের ক্ষেত্রে কোনো টাকা দিতে হয় না। তবে চুক্তিবদ্ধ বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষার জন্য রোগী পাঠিয়ে সরকারি হাসপাতালে ফ্রি রোগী দেখার টাকা উঠিয়ে নেন অনেক চিকিৎসক। আর বাইরে পরীক্ষা করানো মানেই বড় অংকের টাকা। অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রেই ফ্রি বেড বলে কিছু নেই। টাকা ও তদবির না হলে ফ্রি বেড পাওয়া যায় না। সার্জারি ও আইসিইউ রোগী হলে তো খরচের শেষ নেই। আর সার্জারি রোগীকে ওষুধ থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সব ধরনের মেডিকেল উপকরণ বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়।

ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বা চিকিৎসক টিম তাদের পরিচিত উপকরণ সরবরাহকারী ব্যবসায়ীকে রোগীর লোকদের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি করে দেন। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওই ব্যবসায়ী রোগীর লোকদের সঙ্গে উপকরণ সরবরাহের চুক্তি করেন। সব টাকা যায় রোগীর পকেট থেকে। এভাবে পদে পদে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ খরচ মেটাতে গিয়ে সরকারি ফ্রি চিকিৎসা যেন সাধারণ মানুষের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে! সরকারি স্বাস্থ্যসেবার একটি বড় অংশই জনগণকে বহন করতে হচ্ছে। আর দালালদের মাধ্যমে অর্থ লুট ও সীমাহীন হয়রানি সরকারি হাসপাতালের স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ সাদেকুল ইসলাম (কবি, সাহিত্যিক, সংগঠক), উপদেষ্টাঃ মোঃ আঃ হান্নান মিলন, প্রকাশকঃ কামরুন নেছা তানিয়া, সম্পাদকঃ রাজিবুল করিম রোমিও-এম, এস, এস (সমাজ কর্ম), নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসাইন, ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুল আজিজ, সহ-ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ খন্দকার আউয়াল ভাসানী, বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ মিজানুর সরকার

প্রিন্ট করুন