শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬

সোশ্যাল মিডিয়ায় রাজনৈতিক পোস্ট নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন

উজ্জ্বল বাংলাদেশ ডেস্ক

জনপ্রিয় ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ইউটিউবে বেশ পরিচিতি পাওয়া একটি চ্যানেল ‘দ্য দেশভক্ত’। ৬০ লাখেরও বেশি সাবস্ক্রাইবারের এই চ্যানেলের সঞ্চালক ভারতের আকাশ ব্যানার্জি। সাধারণত দেশ ও বৈশ্বিক রাজনীতি-অর্থনীতিসহ সংবাদ ও সমসাময়িক বিষয়গুলো নিয়ে কনটেন্ট তৈরি করেন তিনি। এ ধরনের কনটেন্টের ওপর এবার কঠোর নিয়ন্ত্রণ আনতে যাচ্ছে ভারতের সরকার।

বিবিসির প্রতিবেদনে জানা গেছে, টেক জায়ান্ট ফেসবুক, ইউটিউব এবং এক্স-এর (সাবেক টুইটার) মতো প্ল্যাটফর্মে সংবাদ ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে কাজ করা ইনফ্লুয়েন্সার ও পডকাস্টারদের নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার নতুন এক প্রস্তাবনা দিয়েছে। মূলত অনলাইন সংবাদের নিয়ন্ত্রক কাঠামো আরও বিস্তৃত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গত সপ্তাহে ভারতের ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় দেশটির আইটি (তথ্যপ্রযুক্তি) নিয়মনীতিতে কিছু সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছে। এর ফলে যারা নিবন্ধিত সংবাদ প্রকাশক নন, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংবাদ ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে কনটেন্ট শেয়ার করেন, তাঁদেরও এখন থেকে নিবন্ধিত সংবাদ মাধ্যমগুলোর মতো ‘আচরণবিধি’ (কোড অব এথিক্স) মেনে চলতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদক্ষেপের ফলে সাধারণ ব্যবহারকারী, স্বতন্ত্র সাংবাদিক ও পডকাস্টারদের সংবাদ সংক্রান্ত পোস্টের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়বে। প্রস্তাবনা অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো যদি ‘সেফ হারবার’ সুরক্ষা (ব্যবহারকারীর পোস্ট করা কনটেন্টের জন্য আইনি দায়মুক্তি) বজায় রাখতে চায়, তবে তাদের সরকারি আদেশ ও নির্দেশিকা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।

সরকারের এই প্রস্তাবিত সংশোধনী ডিজিটাল অধিকারকর্মী ও স্বতন্ত্র কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তাঁদের মতে, এর মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপ বা সেন্সর আরোপের পথ সুগম হবে। একই সঙ্গে ভিন্নমতাবলম্বী ও সমালোচকদের লক্ষ্যবস্তু বানাতে এই নিয়মের অপব্যবহার হতে পারে বলেও তাঁরা সতর্ক করেছেন।

সরকারের দাবি, এই সংশোধনীর মাধ্যমে বিদ্যমান আইটি নিয়মগুলো আরও শক্তিশালী হবে এবং ভুয়া খবর, ঘৃণ্য বক্তব্য (হেট স্পিচ) ও ডিপফেক মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। এ বিষয়ে ১৪ এপ্রিলের মধ্যে জনসাধারণের মতামত চেয়েছে মন্ত্রণালয়।

তবে সরকারের এই যুক্তিতে আশ্বস্ত হতে পারছেন না সমালোচকরা। ৬০ লাখেরও বেশি সাবস্ক্রাইবার থাকা ইউটিউব চ্যানেল ‘দ্য দেশভক্ত’-এর সঞ্চালক আকাশ ব্যানার্জি বলেন, এই নিয়মগুলো ক্রিয়েটরদের মধ্যে ভীতির পরিবেশ তৈরি করবে, যা তাঁদের ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ বা স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপের দিকে ঠেলে দেবে।

তিনি আরও বলেন, ‘মজার বিষয় হলো, অনলাইন কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের এত আইন থাকা সত্ত্বেও দেশে ঘৃণ্য বক্তব্য ও ভুয়া খবর কমেনি। উল্টো সরকারের সমালোচনামূলক পোস্টগুলো—এমনকি সেগুলো ব্যঙ্গাত্মক হলেও—বেশি করে ব্লক বা সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।’ তবে কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

গত মাসে আইটি আইনের ৬৯এ ধারায় দেওয়া সরকারি নির্দেশে এক্স (সাবেক টুইটার) প্রায় এক ডজন অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেয়, যাদের অধিকাংশই সরকারের সমালোচনা করে ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট দেওয়ার জন্য পরিচিত। ‘@Nehr_who?’ নামক এক্স অ্যাকাউন্টের মালিক কুমার নয়ন বিবিসিকে জানিয়েছেন, কোনো পূর্ব নোটিশ বা কারণ ছাড়াই তাঁর অ্যাকাউন্ট ব্লক করা হয়েছিল। আদালতের নির্দেশে তাঁর অ্যাকাউন্টটি সচল হলেও ১০টি পোস্ট এখনো ভারতে ব্লক করে রাখা হয়েছে। এসব পোস্টের বেশিরভাগই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বা বিজেপি সরকারের সমালোচনা করে করা।

নয়ন প্রশ্ন তোলেন, ‘কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ বলবে না যে এই পোস্টগুলো জাতীয় নিরাপত্তা বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য হুমকি। এগুলো স্রেফ কৌতুকপূর্ণ পোস্ট, তাহলে সরকার কেন এগুলো সরাতে চায়?’ আদালতের আশ্রয় নেওয়ায় তাঁর পরিচয় এখন প্রকাশ্য, যা নিয়ে তিনি নিরাপত্তার শঙ্কায় রয়েছেন এবং ইতিমধ্যে নিজের বাসস্থান পরিবর্তন করেছেন।

এদিকে, সাম্প্রতিক এক মার্কিন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে,২০২১ সাল থেকে ভারতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর ওপর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পোস্ট ও অ্যাকাউন্ট সরিয়ে নেওয়ার চাপ বাড়ছে।

ডিজিটাল অধিকারকর্মী নিখিল পাহওয়া বলেন, প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো সরকারের ‘গণ-সেন্সরশিপ অবকাঠামো’কে কেবল আরও শক্তিশালী করবে। ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’য় প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালের একটি পরিবর্তনের ফলে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘সহযোগ’ পোর্টালের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে, যার মাধ্যমে স্বচ্ছতার অভাব থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সংস্থা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কনটেন্ট সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিতে পারে।

২০২৬ সালের শুরুর দিকে আইটি নিয়ম আবারও সংশোধন করা হয়, যেখানে সরকারি নির্দেশ পালনের সময়সীমা ৩৬ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে মাত্র ৩ ঘণ্টা করা হয়েছে। এর ফলে আইনি পর্যালোচনার সুযোগও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। পাহওয়া বলেন, ভারতের বাজার ধরতে গিয়ে প্ল্যাটফর্মগুলো এসব নির্দেশ মেনে নিচ্ছে, আর সাধারণ নাগরিকরা তাঁদের বাকস্বাধীনতা হরণের কোনো কারণ বা নোটিশ পাচ্ছেন না।

তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব এস কৃষ্ণান অবশ্য এই নিয়মের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বিবিসিকে বলেন, সংবাদ ও সমসাময়িক বিষয়গুলো এখন আর শুধু সংবাদ প্রকাশকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, সাধারণ মানুষও এগুলো শেয়ার করছে। তাই সবকিছুর জন্য একটি সাধারণ নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।

অন্যদিকে, সন্দীপ সিং নামে এক ব্যক্তির এক্স অ্যাকাউন্ট গত মার্চ থেকে ব্লক করে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, মূলধারার গণমাধ্যমগুলো বিজেপি সরকারের প্রতি ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ মনে হওয়ায় তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হয়েছিলেন। সন্দীপের ভাষ্য, ‘আমি সত্যের পক্ষে এবং আমার অ্যাকাউন্ট বা পোস্ট ব্লক করে আমাকে থামানো যাবে না।’

কুমার নয়ন বলেন, আদালতের যাওয়ার সামর্থ্য সবার থাকে না। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ, তাহলে এখানে নির্ভয়ে নিজের কথা বলা এত কঠিন হয়ে উঠল কেন?’

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ সাদেকুল ইসলাম (কবি, সাহিত্যিক, সংগঠক), উপদেষ্টাঃ মোঃ আঃ হান্নান মিলন, সম্পাদক ও প্রকাশকঃ রাজিবুল করিম রোমিও-এম, এস, এস (সমাজ কর্ম), নির্বাহী সম্পাদকঃ কামরুন নেছা তানিয়া, ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুল আজিজ, সহ-ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ খন্দকার আউয়াল ভাসানী, বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ মিজানুর সরকার

প্রিন্ট করুন