বিশ্বজুড়ে চলমান জ্বালানি সংকটের অনেক আগে থেকেই এর প্রস্তুতি নিচ্ছিল চীন। ২০২১ সালে দেশটির একটি বৃহত্তম তেলখনি পরিদর্শনের সময় প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং বলেছিলেন, চীনকে তার জ্বালানি সরবরাহ ‘নিজের হাতেই’ সুরক্ষিত রাখতে হবে। আজ যখন মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ বিশ্ব বাণিজ্যকে স্থবির করে দিয়েছে, তখন সি চিনপিংয়ের এক দূরদর্শী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সুফল পাচ্ছে বেইজিং।
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনাগুলো এখন হামলার মুখে। শিপিং অ্যানালিস্ট প্রতিষ্ঠান কেপলার-এর তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি ৬১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে এশিয়ার দেশগুলো বড় ধরনের সংকটে পড়েছে, কারণ ২০২৫ সালে তাদের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির ৫৯ শতাংশই আসত এই অঞ্চল থেকে। জাপান, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো এখন জ্বালানি সাশ্রয়ে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও চীন বর্তমানে এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজের গবেষক মিশেল মেইডান বলেন, জ্বালানি ব্যবস্থায় শক্তিশালী ‘বাফার’ বা সুরক্ষা কবচ রয়েছে চীনের। আর সেটা হলো, তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বিশাল মজুত।
কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির তথ্যমতে, চীন প্রায় ১৪০ কোটি ব্যারেল তেলের এক বিশাল মজুতের ওপর বসে আছে।
চীন সাধারণত তার প্রয়োজনীয় তেলের অর্ধেক মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। যদিও এটি একটি বড় অংশ, তবুও জাপানের মতো দেশগুলোর তুলনায় চীনের ঝুঁকি অনেক কম। কারণ জাপান তাদের তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে।
আপাতত তাইওয়ান দখলের চিন্তা নেই চীনের: মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নআপাতত তাইওয়ান দখলের চিন্তা নেই চীনের: মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন
এদিকে, যুদ্ধ চললেও চীনকে তেল সরবরাহ বন্ধ করেনি ইরান। কেপলার-এর তথ্যমতে, ইরান থেকে চীনের তেল আমদানি খুব সামান্যই কমেছে। ফেব্রুয়ারিতে প্রতিদিন ১৫ দশমিক ৭ লাখ ব্যারেল তেল এলেও মার্চে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ৭ লাখ ব্যারেলে। এ ছাড়া চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো বিকল্প পথে তেল সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছে। চলতি মাসের শুরুতে চীনের একটি সুপারট্যাঙ্কার সৌদি আরবের তেল নিতে লোহিত সাগরের একটি বন্দরে গেছে এবং এপ্রিলে তা চীনে পৌঁছাবে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে চীন গত কয়েক বছরে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) মতে, চীন বর্তমানে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সম্মিলিত বিক্রির চেয়েও বেশি ইলেকট্রিক ও হাইব্রিড গাড়ি বিক্রি করে।
এনার্জি থিংক ট্যাংক এম্বার-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চীনের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৩১ শতাংশই এসেছে বায়ু, সৌর এবং জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে। এ ছাড়া যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বেইজিং তার দেশীয় শোধনাগারগুলোকে তেল রপ্তানি বন্ধের নির্দেশ দিয়ে অভ্যন্তরীণ সরবরাহ নিশ্চিত করেছে।
তবে সংকট যদি কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসে গড়ায়, তাহলে পরিস্থিতি চীনের জন্যও বেদনাদায়ক হতে পারে।
অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজের গবেষক মেইডান সতর্ক করে বলেছেন, চীনের কৌশলগত তেল মজুত (এসপিআর) অবমুক্ত করার প্রক্রিয়াটি এখন পর্যন্ত মাত্র একবার পরীক্ষা করা হয়েছে। যদি দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয় এবং তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়, তবেই বেইজিং এই মজুত ব্যবহারের পথে হাঁটবে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে চীনের স্বাধীন তেল শোধনাগারগুলো, যারা মূলত ইরানের তেলের ওপর নির্ভরশীল। যদিও তারা এখন রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে, তবুও শিল্প ও রাসায়নিক খাতে ব্যবহৃত এলএনজির উচ্চমূল্য বেইজিংয়ের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সি চিনপিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী জ্বালানি নিরাপত্তা পুরোপুরি চীনের হাতে না থাকলেও, এই মহাবিপদে তারা বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি স্থিতিস্থাপকতা দেখাতে সক্ষম হচ্ছে।
দ্য গার্ডিয়ান থেকে সংক্ষেপে অনূদিত

