ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকার কাজলারপাড় স্কুল গলিতে বসবাসকারী নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দেওয়া সুইটি সিনহাকে ঘিরে চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ব্যবসায়ীদের হয়রানি ও বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ডের একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ভুক্তভোগীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তিনি যাত্রাবাড়ী, কাজলারপাড়, কোনাপাড়া, ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার এলাকা থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কারখানায় গিয়ে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে নানা অভিযোগ তুলে ব্যবসায়ীদের চাপে ফেলার চেষ্টা করেন।
অভিযোগ রয়েছে, কখনো তিনি নিজেকে সাংবাদিক, কখনো ইঞ্জিনিয়ার, আবার কখনো আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেন। “জাতীয় সাপ্তাহিক অপরাধ বিচিত্রা” নামের একটি গণমাধ্যমের ব্যানার ব্যবহার করে বিভিন্ন ফ্যাক্টরি ও অফিসে গিয়ে ভিডিও ধারণ করেন এবং পরে কথিত অনিয়ম তুলে ধরে সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করেন বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক ব্যবসায়ী।
সম্প্রতি ৪ মার্চ রাত আনুমানিক ৮টার দিকে যাত্রাবাড়ীর কাজলারপাড় এলাকায় একটি পণ্যবাহী ভ্যানগাড়ি আটকের ঘটনা সামনে আসে। অনুসন্ধানে জানা যায়, ভ্যানটি “অর্গানিক প্রোডাক্ট” নামের একটি প্রতিষ্ঠানের পণ্য বহন করছিল। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর অভিযোগ, ঘটনার কয়েকদিন আগে সুইটি সিনহা তাদের কারখানায় গিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করে অর্থ দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে পরে তাদের একটি পণ্যবাহী ভ্যান আটকানো হয় এবং সেখান থেকে প্রসাধনী পণ্যের কিছু কার্টুন সরিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে পুলিশ এসে ভ্যানটি যাত্রাবাড়ী থানায় জব্দ করে পাঠায়।
তবে ভুক্তভোগীর দাবি, ঘটনার পর বিষয়টি মীমাংসার নামে ওই নারী সাংবাদিক এক লক্ষ টাকা দাবি করেন। এ সংক্রান্ত অডিওসহ কিছু তথ্যপ্রমাণ ইতিমধ্যে গণমাধ্যমের হাতে এসেছে বলে জানা গেছে।
এদিকে আরেকটি স্বনামধন্য কনজ্যুমার প্রোডাক্ট ফ্যাক্টরির মালিকের পক্ষ থেকেও একই ধরনের চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তার ফ্যাক্টরি পরিদর্শনের সময় বিভিন্ন অভিযোগ তুলে অর্থ দাবি করা হয় এবং অস্বীকৃতি জানালে তাকে নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে অপপ্রচারণা চালানো হয়।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, “ড্রাগনশেড” নামের একটি সিকিউরিটি প্রতিষ্ঠানের অফিসে গিয়ে এক যুবককে মারধরের একটি ভিডিও ফুটেজও স্থানীয়দের হাতে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ভিডিওতে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করার অভিযোগও উঠেছে।
এরই ধারাবাহিকতায় নতুন করে আরেকটি ঘটনার অভিযোগ সামনে এসেছে। জানা গেছে, গত ৮ মার্চ রাত আনুমানিক ১১টা ২০ মিনিটে সুইটি সিনহা নিজের পরিকল্পিত চাঁদাবাজির কাজে সাংবাদিক জারা হায়াৎকে যুক্ত করতে না পেরে হুমকি দিতে সশরীরে তার বাসায় চলে আসেন। এ সময় তিনি বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন এবং একপর্যায়ে শাসিয়ে বলেন, “আমি যদি তোর সাথে খেলি, তুই জীবনেও সেই খেলায় জিততে পারবি না। আমার মাথায় যত ক্রিমিনাল বুদ্ধি আছে, তুই কল্পনাও করতে পারবি না।”
এ সময় জারা হায়াতের দুই কন্যা ভয় ও আতঙ্কে কান্নাকাটি শুরু করে দেয় বলে জানা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সাংবাদিক জারা হায়াৎ বাধ্য হয়ে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করে ডেমরা থানার পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করেন। পরে ডেমরা থানার এসআই সাইদুল ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেন এবং অভিযুক্ত সুইটি সিনহাকে বাসা থেকে বের করে দেন।
এ ঘটনায় জারা হায়াতের ওপরতলার ভাড়াটিয়া ও পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়াদের সঙ্গেও কথা বলে প্রতিবেদক। তারা জানান, হঠাৎ চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে তারা গেটে এসে দাঁড়ান। তাদের ভাষ্য, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিক জারা হায়াৎ আপাকে চিনি। তার বাসায় এভাবে চিৎকার-চেঁচামেচি কেউ কখনো করেনি। শুনেছিলাম তিনি অসুস্থ, তাই শব্দ শুনে এগিয়ে আসি। আপা তখন বলেন তিনি ৯৯৯-এ কল দিয়েছেন। এর আগেও একদিন এই মেয়েটি এসে তার বাসায় চিৎকার-চেঁচামেচি করেছিল।”
পরবর্তীতে সাংবাদিক জারা হায়াৎ ডেমরা থানায় গিয়ে ঘটনার বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। জানা গেছে, অভিযোগটি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসআই শাহ আলম গ্রহণ করেছেন এবং বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করলে তা বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩৮৪, ৩৮৫ ও ৩৮৬ ধারার আওতায় চাঁদাবাজির গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। প্রতারণা বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে ৪২০ ধারাসহ অন্যান্য প্রযোজ্য আইনের আওতায়ও ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
এদিকে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিকরা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

