★ অভিযানের মূল লক্ষ্য চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের বাহিনীর নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া।
★ প্রায় ৩০০০ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত দুর্গম এই পাহাড়ী এলাকায় বর্তমানে প্রায় ২০ হাজারের অধিক ঘরবাড়ি ও লক্ষাধিক মানুষের বসবাস।
ফজরের নামাজের আগেই কঠোর গোপনীয়তায় চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দেড় হাজারের বেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের সমন্বয়ে বড় ধরনের যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি র্যাব ও সেনাবাহিনীর সদস্যরাও এই অভিযানে অংশ নিয়েছেন।
রবিবার (৮ মার্চ) দিবাগত গভীর রাতে জঙ্গল সলিমপুরের চারদিকের সব প্রবেশপথ ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সোমবার ভোর থেকে বাহিনীর সদস্যরা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে পাহাড়ি ও ঘনবসতিপূর্ণ এই এলাকার ভেতরে প্রবেশ করে তল্লাশি অভিযান শুরু করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে শুরু হওয়া এই অভিযান সোমবার ভোর থেকে শুরু হয়ে মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত চলতে পারে। অভিযানের লক্ষ্য হিসেবে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া, অস্ত্র উদ্ধার এবং চিহ্নিত অপরাধীদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দেড় হাজার সদস্যের বিশাল বাহিনীঃ
এই অভিযানে অংশ নিয়েছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) প্রায় ৮০০ সদস্য এবং চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের প্রায় ৭০০ সদস্য। এছাড়াও র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা যৌথভাবে অভিযানে সহায়তা করছেন।
রাত প্রায় চারটার দিকে নগরীর আগ্রাবাদ ছোটপুল পুলিশ লাইন্স থেকে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য গাড়িবহর নিয়ে জঙ্গল সলিমপুরের উদ্দেশে রওনা হন। একই সময়ে বিভিন্ন স্থান থেকে যৌথবাহিনীর অন্যান্য সদস্যরাও এলাকাটিতে অবস্থান নেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা প্রথমে এলাকার সব প্রবেশমুখ নিয়ন্ত্রণে নেন। পরে ভোরের দিকে ধাপে ধাপে পাহাড়ি বসতিগুলোর দিকে অভিযান পরিচালনা শুরু করা হয়।
টার্গেটে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নেটওয়ার্কঃ
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, অভিযানের প্রধান লক্ষ্য চট্টগ্রাম নগর সহ বৃহত্তর চট্টগ্রামে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের বাহিনীর নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া। পাশাপাশি চাঁদাবাজী দখলবাজীর সাথে সম্পৃক্ত চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের পাকড়াও করা। দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের প্রভাব রয়েছে বলে কথিত আছে।
যে গ্রুপগুলো টার্গেটঃ
এলাকাটিতে সক্রিয় কয়েকটি গ্রুপের মধ্যে রয়েছে ইয়াসিন গ্রুপ, রোকন গ্রুপ ও রিদোয়ান গ্রুপ। এর মধ্যে ইয়াসিন গ্রুপকে সবচেয়ে শক্তিশালী বলে মনে করা হয় এবং এলাকার একটি বড় অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা।
এসব গ্রুপের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, জমি দখল, মাদক ব্যবসা, অস্ত্রের অবৈধ বেচাকেনা এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
‘দেশের ভেতর আরেক দেশ’ জঙ্গল সলিমপুরঃ
চট্টগ্রাম নগরীর খুব কাছাকাছি হলেও জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য একটি চ্যালেঞ্জিং এলাকা হিসেবে পরিচিত। অনেকেই এলাকাটিকে ‘দেশের ভেতর আরেক দেশ’ কিংবা ‘সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ বলে উল্লেখ করেন। এই জনপদে পরিচিত ছাড়া বিনা অনুমতিতে কেউ প্রবেশ করতে পারেনা বলেও প্রচলিত আছে।
বায়েজিদ লিংক রোডের উত্তর পাশে প্রায় তিন হাজার ১০০ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই এলাকা পাহাড়ি ও দুর্গম। বর্তমানে সেখানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার ঘরবাড়ি রয়েছে এবং বিভিন্ন জেলা থেকে আসা অন্তত এক থেকে দেড় লাখ মানুষের বসবাস।
অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা বসতি, সরু রাস্তা, পাহাড়ি পথ এবং ঘনবসতির কারণে দীর্ঘদিন ধরেই এলাকাটিতে নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা অভিযান চালানো কঠিন ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
র্যাবের ওপর হামলার পর নতুন উদ্যোগঃ
গত ১৯ জানুয়ারি জঙ্গল সলিমপুরে কয়েকজন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে অভিযান চালাতে গেলে র্যাব সদস্যরা হামলার মুখে পড়েন।
সেসময় লাঠিসোঁটা হাতে কয়েকশ মানুষ র্যাবের দুটি মাইক্রোবাস ধাওয়া করে এবং গাড়ির গ্লাস ভাঙচুর করে। অভিযোগ রয়েছে, র্যাব সদস্যদের লক্ষ্য করে প্রকাশ্যে গুলিও চালানো হয়।
একপর্যায়ে হামলাকারীরা র্যাবের কয়েকজন সদস্যকে মারধর করে এবং তাদের অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়। ওই ঘটনায় র্যাব–৭ এর উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন এবং আরও তিনজন সদস্য আহত হন।
র্যাবের তথ্যমতে, ওই হামলায় প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ জন অংশ নিয়েছিল। ঘটনার পর জড়িতদের গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালানোর কথা বলা হলেও এত বড় আকারের সমন্বিত অভিযান এবারই প্রথম শুরু হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অপরাধ দমন ও স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই অভিযান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
