চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কে গলা কাটা অবস্থায় উদ্ধার হওয়া দ্বিতীয় শ্রেনীর ছাত্রী ৭ বছর বয়সী শিশু জান্নাতুল নিশা ইরা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। ঘটনার মূল অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
মঙ্গলবার (৩ মার্চ) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় ইরা। বিষয়টি নিশ্চিত করেন তার চাচা মো. রমিজ।
গত রবিবার (১ মার্চ) সকালে সীতাকুণ্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক-এর দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় গলা কাটা অবস্থায় শিশুটিকে উদ্ধার করেন চন্দ্রনাথ মন্দির সড়ক সংস্কারকাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা। প্রথমে তাকে সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ ভর্তি করা হয়। রবিবার চমেকে ইরার গলায় অস্ত্রোপচার করা হয়। সোমবার তাকে ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) নেওয়া হলে শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। পুনরায় ইএনটি ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। ৩ মার্চ মঙ্গলবার ভোরে আইসিইউতে তার মৃত্যু হয়।।ইরা সীতাকুণ্ডের কুমিরা ইউনিয়নের মাস্টারপাড়া গ্রামের দরিদ্র রিকশাচালক মনিরুল ইসলামের মেয়ে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, স্কুল বন্ধ থাকায় ইরা প্রতিদিনের মতো তার দাদার বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়েছিল। কিন্তু বাড়ি থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় পাওয়া যায়।
চিকিৎসকরা জানান, শিশুটির শরীরে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং সে ধর্ষণের শিকার হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ঘটনার দিন ১ মার্চ রবিবার রাতেই শিশুটির মা বাদী হয়ে সীতাকুণ্ড থানা-য় অপহরণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন। শিশুটির মৃত্যুর পর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হচ্ছে।
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (শিল্পাঞ্চল ও ডিবি) মো. রাসেল জানান, “ঘটনার মূল অভিযুক্ত প্রধান আসামী প্রতিবেশী মাহাবুব শেখকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিস্তারিত তথ্য সংবাদ সম্মেলনে জানানো হবে।”
ঘটনার পর পর শিশু ইরা কান্ডে দেশব্যাপী সমালোচনার ঝড় উঠে। পুলিশ কোনো ক্লু খুঁজে না পেলেও র্যাব-৭ এবং পুলিশের যৌথ প্রচেষ্টায় চন্দ্রনাথ ধাম পাহাড়ের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হয়। ফুটেজে দেখা যায়, এক মধ্যবয়সী ব্যক্তি ইরাকে নিয়ে চন্দ্রনাথ ধামের দিকে যাচ্ছে। পরিবারের সদস্যরা ওই ব্যক্তিকে তাদের প্রতিবেশী ভাড়াটিয়া মাহবুব (৫০) হিসেবে শনাক্ত করেন। পরে অভিযান চালিয়ে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
সীতাকুণ্ড থানার ওসি মো. মহিনুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে খুনিকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপরাধীকে উপযুক্ত সাজা প্রদানের লক্ষে আদালতে পাঠানো হবে বলে তিনি জানান।
ইরার চাচা আজিজ বলেন,
“সোমবার রাত সাড়ে ৯টার দিকেও সে ইশারায় আমাদের সঙ্গে কথা বলছিল। পরে রাত আড়াইটার দিকে তার অবস্থার অবনতি হয়। সে ইশারায় পানি ও খাবার চাইছিল, কিন্তু চিকিৎসকদের নিষেধ থাকায় কিছু দিতে পারিনি।” পরিবারের দাবি, মৃত্যুর আগে শিশুটি ইশারায় একটি নাম বোঝানোর চেষ্টা করেছিল।
নৃশংস এই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভ ও শোকের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। শিশু ইরাকে হত্যা চেষ্টার পর দুর্গম পাহাড় থেকে উদ্ধার, চিকিৎসা, মামলা দায়ের, মৃত্যুর ঘটনা এবং প্রধান অভিযুক্ত গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে মামলাটি এখন পূর্ণাঙ্গ হত্যা মামলায় রূপ নিচ্ছে।

