সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬

সেনবংশের করুণ ইতিহাস

উজ্জ্বল বাংলাদেশ ডেস্ক

লক্ষ্মণসেনের মৃত্যুর পর সেনবংশের ভাগ্যে আর স্থিতি রইল না। রাজসিংহাসনে আরোহণ করলেন মাধবসেন, কিন্তু তাঁর রাজত্বকাল মূলত আত্মরক্ষা ও অস্থিরতার মধ্যেই কেটে যায়। মুসলমান আক্রমণের মুখে অবশিষ্ট সেনরাজ্য রক্ষা করাই হয়ে ওঠে তাঁর প্রধান কর্তব্য। ফলে সুসংহত প্রশাসন ও দীর্ঘমেয়াদি শাসনব্যবস্থার দিকে বিশেষ মন দেওয়া সম্ভব হয়নি।
হরিমিশ্রের কারিকা থেকে জানা যায়, মাধবসেন রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণদের বিশেষভাবে চারিবরণ বা সমীকরণ করেন। সম্ভবত এই ব্রাহ্মণসমাজকে কেন্দ্র করেই সেনরাজারা ক্রমশ ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন এবং রাজ্যের সুশাসন দুর্বল হয়ে যায়। একপর্যায়ে মাধবসেন রাজ্যভার ভ্রাতা কেশবসেনের হাতে অর্পণ করে নিজে হিমালয় প্রদেশে তীর্থযাত্রায় গমন করেন।
কুমায়ূনের আলমোড়ার নিকটবর্তী যোগেশ্বর মন্দিরের শিলালিপিতে মাধবসেনের কীর্তির উল্লেখ রয়েছে। তাঁর সঙ্গে বহু ব্রাহ্মণও তীর্থভ্রমণে গমন করেন। কেদারভূমির বাণেশ্বর মন্দিরে প্রাপ্ত এক তাম্রশাসনে ভট্টনারায়ণ বংশীয় রুদ্রশর্ম্মার নাম পাওয়া যায়। আবার সূক্তিকর্ণামৃত গ্রন্থে মাধবসেনের রচিত কবিতাও সংরক্ষিত আছে। সাধারণভাবে মনে করা হয়, মাধবসেন প্রায় দশ বছর রাজত্ব করেন।
মাধবসেনের পর সেনসিংহাসনে বসেন কেশবসেন। কিন্তু তাঁর পক্ষে গৌড় রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। মুসলমানদের অগ্রগতির ফলে তিনি পূর্ববঙ্গে সরে যেতে বাধ্য হন এবং অনুমান করা হয় যে, ১২১৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তাঁর রাজত্ব বিস্তৃত ছিল। এই সময় বহু ব্রাহ্মণ গৌড় ত্যাগ করে কেশবসেনের সঙ্গে পূর্ববঙ্গে গমন করেন।
কেশবসেনের সভাসদ এডুমিশ্র উল্লেখ করেছেন, মুসলমানেরা গৌড় ও নদীয়া অধিকার করলে কেশবসেন পিতামহ লক্ষ্মণসেন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত কুলীনদের সঙ্গে নিয়ে বিক্রমপুরে এক সেন-রাজার আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেই সেনরাজা এডুমিশ্রকে অনুরোধ করলে তিনি বল্লালী কুলীন নিয়ম প্রণয়ন করেন। তবে এই সেন-রাজার নাম আজও ইতিহাসে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত হয়নি।
কেশবসেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হয়েছে, যা মূলত মাধবসেনের সময়ে লিখিত হলেও পরে কেশবসেনের নামে দান হওয়ায় পূর্ববর্তী নাম কেটে নতুন নাম খোদাই করা হয়। এই তাম্রশাসন থেকে জানা যায় যে কেশবসেন ছিলেন সৌর উপাসক, এবং তাঁর দীর্ঘ উপাধির মধ্যে ‘শঙ্কর গৌড়েশ্বর’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সেনবংশের প্রায় সকল রাজার ক্ষেত্রেই এই উপাধির ব্যবহার দেখা যায়।
এই তাম্রশাসন থেকে আরও জানা যায়, দানকৃত ভূমি ছিল পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তির অন্তর্গত বিক্রমপুর অঞ্চলে। পালরাজাদের তাম্রশাসনে যেখানে পুণ্ড্রবর্ধন, তীরভুক্তি ও শ্রীনগর—এই তিনটি ভুক্তির উল্লেখ পাওয়া যায়, সেখানে সেনরাজাদের ক্ষেত্রে কেবল পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তির নামই পাওয়া যায়। এর থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় যে, সেনরাজ্যের বিস্তার পালরাজ্যের তুলনায় অনেক সীমিত ছিল। কেশবসেনের সময় কার্যত শুধু বিক্রমপুর অঞ্চলই সেনদের অধিকারে ছিল; বঙ্গের বাকি অংশ মুসলমানদের করায়ত্ত হয়ে পড়ে।
এই সংকটময় সময়ে সেনবংশের শেষ শক্তিমান প্রতিনিধি হিসেবে আবির্ভূত হন বিশ্বরূপ সেন—লক্ষ্মণসেনের কনিষ্ঠ পুত্র ও বসুদেবীর গর্ভজাত সন্তান। তিনি ছিলেন তাঁর ভ্রাতাদের তুলনায় অধিক বীর ও সংগ্রামী। মুসলমানদের অগ্রযাত্রা প্রতিহত করতে তিনি বহু চেষ্টা করেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে পূর্ববঙ্গে সরে যেতে বাধ্য হন। কেশবসেনের মৃত্যুর পর ১২১৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি সেনসিংহাসনে আরোহণ করেন।
বিশ্বরূপ সেনের প্রদত্ত একটি তাম্রশাসন আজও পাওয়া যায়, যা কেশবসেনের দানীয় ঈশ্বর দেবশর্ম্মার ভ্রাতা বিশ্বরূপ দেবশর্ম্মাকে প্রদান করা হয়েছিল। এতে দুটি ভূমিদানের উল্লেখ আছে—একটির পরিমাণ ৬০০, অপরটির ৫৪৭। এর মধ্যে একটি ভূমি ছিল পোঞ্জিকাপী গ্রামে, যার বর্তমান নাম পিঞ্জারী—বর্তমান ফরিদপুর জেলার অন্তর্গত।
এইভাবেই লক্ষ্মণসেনের পরবর্তী যুগে সেনবংশ ক্রমশ শক্তি, ভূখণ্ড ও রাজনৈতিক প্রভাব হারিয়ে ইতিহাসের অন্তিম প্রান্তে উপনীত হয়—যা মধ্যযুগীয় বাংলার এক করুণ ও শিক্ষণীয় অধ্যায়।

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ সাদেকুল ইসলাম (কবি, সাহিত্যিক, সংগঠক), উপদেষ্টাঃ মোঃ আঃ হান্নান মিলন, প্রকাশকঃ কামরুন নেছা তানিয়া, সম্পাদকঃ রাজিবুল করিম রোমিও-এম, এস, এস (সমাজ কর্ম), নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসাইন, ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুল আজিজ, সহ-ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ খন্দকার আউয়াল ভাসানী, বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ মিজানুর সরকার

প্রিন্ট করুন