শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬

চলনবিলের পালাগান বিলুপ্তির পথে

লেখক:মোঃ মাজেম আলী মলিন,সহকারী অধ্যাপক বিভাগীয় প্রধান রোজী মোজাম্মেল মহিলা অনার্স কলেজ

মোঃ মাজেম আলী মলিন: একসময় চলনবিল ছিল শুধু জল, কাদা, মাছ আর পাখির দেশ নয়; ছিল সুর, কাহিনি, প্রেম, প্রতিবাদ ও বিশ্বাসে গড়া এক সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক মহাসড়ক। নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও আশপাশের এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পালাগান ছিল মানুষের প্রাণের উৎসব, সমাজচেতনার প্রতিধ্বনি। ভাদ্র মাস এলেই গ্রাম থেকে গ্রামে শুরু হতো পালাগানের আসর। নৌকাবাইচ, গ্রামীণ মেলা, হারমোনিয়ামের সুর আর ঢোলের তালে নেচে উঠত জনপদ। বেহুলা-লখিন্দর, মনসামঙ্গল, মহুয়া, ভাদু কিংবা ধনপতির পালা—সবই ছিল মানুষের আনন্দ, বেদনা আর আত্মপরিচয়ের গল্প।
কিন্তু আজ সেই সুর থেমে গেছে। প্রযুক্তির শব্দে ডুবে গেছে পালাগানের কণ্ঠস্বর। একসময়ের প্রাণবন্ত সেই লোকসংস্কৃতি আজ স্মৃতি হয়ে ঝুলে আছে চলনবিলের বাতাসে। স্থানীয় প্রবীণরা জানান, একসময় ভাদ্র-আশ্বিন মাস এলেই প্রতিটি গ্রামে পালাগানের মঞ্চ বসত, সারারাত গান শুনতে ভিড় করত শত শত মানুষ। প্রেম, বিরহ, সামাজিক অবিচার, নারীর সাহস আর প্রতিরোধের কাহিনি পালাগানের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ত মানুষের মনে। পালাগান ছিল কেবল বিনোদন নয়, ছিল গ্রামীণ জীবনের জীবন্ত নাট্যরূপ।
এক বেসরকারি জরিপে দেখা গেছে, ২০০৫ সালে নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে প্রায় ২৭০টি পালাগানের দল সক্রিয় ছিল। ২০১৫ সালে সেই সংখ্যা কমে আসে ৮০-তে। আর ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, আজ টিকে আছে ১৫টিরও কম দল। অর্থাৎ দুই দশকে পালাগানের মঞ্চ প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।
গুরুদাসপুর উপজেলার ৭৬ বছর বয়সী প্রবীণ বীর মুক্তিযোদ্ধা ও পালাকার আব্দুল কাদের বলেন, “একসময় শুধু গুরুদাসপুরেই ১০-১২টা পালাদল সক্রিয় ছিল। প্রতিটি মৌসুমেই পালাগানের ডাক পড়ত গ্রাম থেকে গ্রামে। কিন্তু এখন টেলিভিশন, ইউটিউব আর সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে নতুন প্রজন্ম আর এসবের দিকে ফিরেও তাকায় না। বছর ঘুরে হয়তো প্রবীণরা দুই-একটা অনুষ্ঠান করে স্মৃতিটা টিকিয়ে রাখার জন্য , কিন্তু সেই আগ্রহটাও আজ আর নেই।”
পাবনার আটঘরিয়ার শিল্পী রওশন আলীও একই বেদনার কথা বললেন—“পালাগান একসময় ছিল জীবনের আনন্দ, এখন সেটা ইতিহাস। কেউ আর পৃষ্ঠপোষকতা করে না, আয়োজকও মেলে না। তাই এখন দিনমজুরি করে বেঁচে আছি। দুঃখ লাগে, এই প্রজন্মের কানে আর পালার সুর পৌঁছায় না।”
চলনবিলের লোকজ সংস্কৃতির গভীরে এখনো ভেসে বেড়ায় বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনি। বিলের হাওয়ায় যেন আজও শোনা যায় বেহুলার নিঃশ্বাস, ভাদ্র মাসের রাতে পালাগানের সুরে জেগে ওঠে তার অনন্ত প্রেম ও ত্যাগের গল্প। একসময় এই বিলের পাড়ে, হাটে বা গ্রামের উঠোনে পালাগানের দল গেয়ে যেত বেহুলার যাত্রা, লখিন্দরের মৃত্যুর আর দেবীর অভিশাপ ভাঙার গল্প। সে সুরে মিশে থাকত বিলপাড়ের মানুষের হাসি-কান্না, জীবনের জয়গান।
আজ পালাগানের সেই দিন আর নেই, তবু চলনবিলের বাতাসে এখনো বেহুলার গল্পের প্রতিধ্বনি শোনা যায়—যেন লোকসংস্কৃতির বুকেই সে বেঁচে আছে, অবিনশ্বর প্রেমের এক অনন্ত প্রতীক হয়ে।
চলনবিলের পালাগান হারিয়ে যাওয়ার পেছনে রয়েছে নানান জটিল বাস্তবতা। টেলিভিশন, ইউটিউব ও ফেসবুকের মতো প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের দাপটে পালাগানের মঞ্চ হারিয়েছে তার দর্শক। অর্থনৈতিক দারিদ্র্য পালাকারদের পেশায় টিকে থাকা কঠিন করে তুলেছে। অনেকে পালা ছেড়ে কৃষি শ্রমিক, দিনমজুর বা রিকশাচালক হয়েছেন। সরকারিভাবে কোনো পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় শিল্পটি টিকে থাকার অবলম্বন হারিয়েছে। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম এই ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত নয়; পরিবার কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেও পালাগানের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক গড়ে উঠছে না। অন্যদিকে নগরায়ণ ও জায়গার সংকট পালাগানের ঐতিহ্যিক আসরগুলোকে বিলীন করে দিয়েছে। এক সময় যেখানে খোলা মাঠে পালার আসর বসত, আজ সেসব জায়গা দখল করেছে বাজার, সড়ক আর আধুনিক স্থাপনা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, “পালাগান ছিল বাংলার গ্রামীণ সমাজের আত্মা। এই ধারার পতন আমাদের সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্ব নির্দেশ করে।” জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. ফারজানা জুঁই মনে করেন, “চলনবিলের মতো অঞ্চলগুলো হারিয়ে গেলে শুধু একটি ঐতিহ্য নয়, হারিয়ে যাবে আমাদের সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের অংশ। লোকসংস্কৃতির মাটি ভেঙে গেলে জাতির আত্মপরিচয়ও বিপন্ন হয়ে পড়ে।” লোকসংস্কৃতি গবেষক অধ্যাপক তাহমিনা ফেরদৌস বলেন, “পালাগানে আমরা পেতাম নারীর প্রতিবাদ, প্রেম ও সাহসের চিত্র। সেই সংস্কৃতির পাঠশালা আজ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।”
‘চলনবিলের ইতিকথা’ গ্রন্থের লেখক আব্দুল হামিদের তথ্যমতে, চলনবিল যাদুঘরে এখনো কিছু লোকসাংস্কৃতিক উপকরণ সংরক্ষিত আছে—বেহুলা-লখিন্দরের পালায় ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র, পোশাক, প্রাচীন পুঁথি ও মুখোশ। তবে গবেষকদের মতে, দেয়ালে টাঙানো নিদর্শন দিয়ে কোনো সংস্কৃতি টিকে থাকে না; টিকে থাকতে হলে তাকে ফিরিয়ে আনতে হয় মানুষের জীবনে, মাটির গন্ধে, উৎসবের উল্লাসে।
লোকসংস্কৃতি রক্ষায় বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি করণীয়ের পরামর্শ দিয়েছেন। তারা মনে করেন, সরকারি উদ্যোগে লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণ আইন প্রণয়ন, স্কুল-কলেজে ঐচ্ছিক পাঠ্যক্রমে পালাগান অন্তর্ভুক্ত করা, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে লোকগান উৎসব আয়োজন, পালাকারদের মাসিক সম্মানী ও বয়স্ক ভাতা চালু করা, এবং ডিজিটাল আর্কাইভ গঠন এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি গণমাধ্যমে লোকসংস্কৃতির নিয়মিত প্রচার ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘লোকসংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্র’ স্থাপনেরও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
চলনবিল আজ তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হারিয়ে কাঁদছে। প্রযুক্তির কোলাহলে হারিয়ে যাচ্ছে হারমোনিয়ামের মৃদু সুর, বেহুলার গান আর লখিন্দরের কাহিনি। পালাগান হারিয়ে যাওয়া মানে কেবল একটি শিল্পের ক্ষয় নয়, এটি এক গভীর আত্মপরিচয়ের মাটিতে ধস নামার পূর্বাভাস।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি আবার বেহুলার চোখ দিয়ে নিজেদের সংস্কৃতির স্বপ্ন দেখতে পারি না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আজই উদ্যোগ নিতে হবে, গাইতে হবে, লিখতে হবে, শুনাতে হবে—কারণ হারিয়ে যাওয়ার আগেই আমাদের থামাতে হবে।

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ সাদেকুল ইসলাম (কবি, সাহিত্যিক, সংগঠক), উপদেষ্টাঃ মোঃ মাহিদুল হাসান সরকার, উপদেষ্টাঃ মোঃ আঃ হান্নান মিলন, প্রকাশকঃ কামরুন নেছা তানিয়া, সম্পাদকঃ রাজিবুল করিম রোমিও-এম, এস, এস (সমাজ কর্ম-রাজশাহী), সহ-সম্পাদকঃ রুবিনা শেখ, ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুল আজিজ, নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসাইন, বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ মিজানুর সরকার

প্রিন্ট করুন