সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬

ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে কেন ব্যর্থ ইসরায়েল?

উজ্জ্বল বাংলাদেশ ডেস্ক

ইসরায়েলের বৃহত্তম তেল শোধনাগার হাইফার বাজানে ইরান ও হিজবুল্লাহ আজ সোমবার হামলা চালিয়েছে। হামলার পর বাজান ওয়েল রিফাইনারি বা তেল শোধনাগারে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। এর আগে, গতকাল রোববার ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলীয় নেগেভ মরুভূমিতে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ শিল্প এলাকা নেওত হোভাভের একটি কারখানায়ও হামলা হয়।

এই শিল্পাঞ্চলটি রাসায়নিক কারখানার জন্য পরিচিত। এই এলাকায় আঘাতের ফলে বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ইসরায়েলের ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ সার্ভিস জানায়, একটি কীটনাশক ট্যাংকে আঘাত লেগেছে। ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া ভিডিওতে দেখা গেছে, সেখানে ভয়াবহ আগুন জ্বলছে এবং আকাশে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে।

নিরাপত্তার স্বার্থে সাধারণ মানুষকে ওই এলাকায় যেতে নিষেধ করা হয়। পরিস্থিতি মূল্যায়ন না করা পর্যন্ত সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের নির্দেশ মেনে চলার পাশাপাশি আশপাশের বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে থাকতে এবং জানালা বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। উদ্ধারকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর পরবর্তী নির্দেশনার ওপর কড়া নজর রাখতে বলা হয়।

এসব হামলার পর একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, ইসরায়েলি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন আর আগের মতো সফলভাবে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন ঠেকাতে পারছে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো ইসরায়েলের তথাকথিত দুর্দান্ত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার এই বেহাল দশা কেন।

যদিও ইসরায়েল তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ৯০ শতাংশ সফলতার দাবি করে, কিন্তু সপ্তাহখানেক আগে ইসরায়েলের পারমাণবিক কর্মসূচি এলাকা দিমোনা ও আরাদে পৃথক দুটি আঘাতের পর ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অজেয় অবস্থায় নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। কারণ, উভয় ক্ষেত্রেই পরে জানা গেছে, ডেভিড’স স্লিং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি ব্যর্থ হয়েছিল।

তবে ইসরায়েল কেবল ডেভিডস স্লিং নয়, আয়রন ডোম এবং অ্যারো নামে আরও দুই ধরনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে থাকে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা দপ্তর দাবি করে, ইরান ও হিজবুল্লাহর হুমকি মোকাবিলায় তাদের কাছে পর্যাপ্ত ইন্টারসেপ্টর বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক রয়েছে, তবে অন্যান্য সূত্রের খবর অনুযায়ী ভবিষ্যতে এর ঘাটতি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সাধারণত অ্যারো সিস্টেমের প্রতিটি ইন্টারসেপ্টরের খরচ ২০ থেকে ৩০ লাখ শেকেল বা ৭ থেকে ১০ লাখ ডলার এবং ডেভিডস স্লিংয়ের প্রতি ইন্টারসেপ্টরে খরচ হয় ১০ লাখ শেকেল বা ৩ লাখ ডলারের কিছু বেশি। সাধারণত, ডেভিডস স্লিং দিয়ে ৪০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়।

ডেভিডস স্লিং ব্যর্থ হওয়ার বেশ কিছু কারণ আছে বলে মনে করেন, ইসরায়েলের সাবেক এয়ার অ্যান্ড মিসাইল ডিফেন্স কমান্ডার এবং আইডিএফ মুখপাত্র রান কোচাভ। তিনি বলেন, ‘প্রথম কারণটি হলো ইসরায়েলি কমান্ডারদের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের নীতি—কোন হুমকির বিপরীতে কোন ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করা হবে। এখানে অ্যারো, থাড (THAAD) বা আয়রন ডোমের মধ্যে একটি কৌশলগত পছন্দ বেছে নিতে হয়। এটা করা হয় যাতে একটি সাধারণ রকেটের পেছনে দামি ক্ষেপণাস্ত্র নষ্ট না হয়, কিংবা এমন ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার না হয় যা অন্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়েই সহজে সামলানো যেত।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের মজুত হিসাব করতে হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।’ কোচাভ উল্লেখ করেন, অ্যারোর এক ধাপ নিচে থাকা অর্থাৎ পাল্লা কিছুটা কম থাকা ডেভিডস স্লিং আগেও সফলভাবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। তবে তিনি এটাও জানান যে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত মাঝে মাঝে ব্যর্থতার দিকেও নিয়ে যেতে পারে।

কোচাভ বলেন, দ্বিতীয় কারণ হলো—রাডার ট্র্যাকিং সিস্টেমে কারিগরি বা ইঞ্জিনিয়ারিং ত্রুটি দেখা দিতে পারে, ইন্টারসেপ্টরের নিজস্ব সমস্যা হতে পারে কিংবা বিভিন্ন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যকার সংযোগেও গোলমাল হতে পারে। ধারণা করা হয়, ইরান ইসরায়েলের সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় বেশ ভালোভাবেই আঘাত হানতে পেরেছে। যদিও ইসরায়েলি বা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই বিষয়ে কোনো স্পষ্ট প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি।

তৃতীয় কারণ হিসেবে কোচাভ ‘পরিসংখ্যানের’ বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর ভাষায়, ‘এটি অত্যন্ত অত্যাধুনিক একটি ব্যবস্থা, তবে এটি নিশ্ছিদ্র বা শতভাগ ত্রুটিহীন নয়।’ অন্য কথায়, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও মাঝে মাঝে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনা বা দুর্ভাগ্যের কারণে লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, অ্যারো সিস্টেমেরও লক্ষ্যভেদের হার অনেক বেশি হলেও সেটিও মাঝে মাঝে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে।

এরই মধ্যে খবর পাওয়া গেছে, ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্রগুলোতে ৫০-৭০ শতাংশ ক্লাস্টার মিউনিশনস বা গুচ্ছ বোমা ব্যবহার করছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোতে অনেক ছোট ছোট বোমা থাকে যা অনেক বড় এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, যদিও সাধারণ ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় এর ধ্বংসক্ষমতা কিছুটা কম হয়। কিন্তু এই বিষয়টিই ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ক্লান্ত করে ফেলেছে।

ইসরায়েলিরা যদিও স্বীকার করেনি যে, তাদের ইন্টারসেপ্টরের মজুত ফুরিয়ে আসছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যম বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছিল যে, ইসরায়েলের ইন্টারসেপ্টর ফুরিয়ে আসছে। এমনও গুঞ্জন ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্সের বরাতে প্রকাশিত হয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরিয়ে ইসরায়েলকে দিচ্ছে। যদিও এই ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল কেউই নিশ্চিত করেনি। কিন্তু এমনটা হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে।

আরেকটি বিষয় হলো, ইরান ধারাবাহিকভাবে ইসরায়েলে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়েই যাচ্ছে। এর মধ্যে আবার কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ক্লাস্টার মিউনিশনস ব্যবহার করছে। কিন্তু একটি ইন্টারসেপ্টর একটি মাত্র টার্গেট ব্যবহার করতে পারে। তাই, যখন কোনো ক্ষেপণাস্ত্র ক্লাস্টার মিউনিশনস ব্যবহার করে তখন ছোটখাটো কমদামি টার্গেটের জন্য কয়েক লাখ ডলার মূল্যের ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করতে হয়।

ইসরায়েলের এখনো আশঙ্কা যে, ইরানের হাতে এখনো ১ হাজারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র এবং আরও কয়েক হাজার ড্রোন রয়ে গেছে। এসব সক্ষমতা ব্যবহার করে যদি ইরান ইসরায়েলে কখনো ঝাঁক বেঁধে আক্রমণ করার কৌশল নেয়, তখন ইসরায়েলি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চরম পরীক্ষা দিতে হবে। আর নতুন ইন্টারসেপ্টর তৈরি করতে যেহেতু দুই থেকে তিন বছর সময় লাগে। তাই ইসরায়েল দ্রুতগতিতে অ্যারো তৈরির চেষ্টা করলেও এই যুদ্ধের সময়ের মধ্যে একবার ঘাটতি পড়ে গেলে তা পূরণ করা সম্ভব হবে না। এটা ইসরায়েলের জন্য এক ধরনের উভয়সংকট।

কিছু ইসরায়েলি কর্মকর্তা ফাঁস করেছেন যে, তাদের পরিকল্পনা ছিল ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত অপেক্ষা করে তারপর ইরানে হামলা চালানো। কিন্তু জানুয়ারিতে ইরানে বিক্ষোভের কারণে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্প প্রশাসনকে এই বিষয়ে অতি আগ্রহী করে তোলে। সহজ কথায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পাশে পাওয়ার সুযোগ কাজে লাগাতে ইসরায়েল হয়তো কিছুটা অপ্রস্তুত অবস্থাতেই এই যুদ্ধে নেমে পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আরেকটি বিষয় হলো—ইরানে হামলা চালানোর পর ইসরায়েলি ও মার্কিনিরা বেশ আত্মতুষ্টিতে ভুগছিল। তাদের ধারণা ছিল যে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা গেছে ভালোভাবেই। তবে ইরান থেকে অনবরত ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং অবকাঠামো ও বেসামরিক জনপদ লক্ষ্য করে প্রতিদিনের হামলা এটাই প্রমাণ করে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অভিযানিক সাফল্যের যে দাবি করা হচ্ছিল তা হয়তো বাস্তবতার চেয়ে বেশি বাড়িয়ে বলা হয়েছিল।

তথ্যসূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট, জেরুসালেম পোস্ট ও ওয়াইনেট

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ সাদেকুল ইসলাম (কবি, সাহিত্যিক, সংগঠক), উপদেষ্টাঃ মোঃ আঃ হান্নান মিলন, প্রকাশকঃ কামরুন নেছা তানিয়া, সম্পাদকঃ রাজিবুল করিম রোমিও-এম, এস, এস (সমাজ কর্ম), নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসাইন, ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুল আজিজ, সহ-ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ খন্দকার আউয়াল ভাসানী, বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ মিজানুর সরকার

প্রিন্ট করুন