শহীদ আব্দুল মান্নান ইয়াহইয়া! স্বাধীনতার সূর্য যে দেশে উদিত হয়েছিল রক্তস্নাত প্রভাতে, সেই দেশেই একদিন স্বৈরাচারের অন্ধকার নেমে আসে নির্বাক, নির্মম, নির্দয়। সেই অন্ধকারের গ্রাসে হারিয়ে যায় কানাইঘাটের এক মেধাবী তরুণ—শহীদ আব্দুল মান্নান ইয়াহইয়া। এক নীরব ট্র্যাজেডির নাম, এক অব্যক্ত বেদনার ইতিহাস।
সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার ৯নং রাজাগঞ্জ ইউনিয়নের ফালজুর গ্রামের সন্তান তিনি। পিতা বীর মুক্তিযোদ্ধা মঈন উদ্দিন সাহেব। যিনি স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছেন, বুক পেতে দিয়েছিলেন গুলির সামনে। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস স্বাধীন দেশে তাকেই দেখতে হয়েছে নিজের নিরপরাধ সন্তানের উপর নিষ্ঠুর নির্যাতনের বিভীষিকা। শেষ পর্যন্ত কাঁধে তুলতে হয়েছে সন্তানের নিথর দেহ। আহা! সেই লাশের ভার কি শুধু দেহের ছিল? না, তা ছিল ইতিহাসের, অবিচারের, আর্তনাদের ভার।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন ইয়াহইয়া। তিনি ছিলেন কুরআনের হাফেজ, একই সঙ্গে আধুনিক ও নৈতিকতাবোধে দৃঢ় এক তরুণ। চিন্তায় প্রখর, চরিত্রে নির্মল। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে কথা বলাই ছিল তাঁর ‘অপরাধ’।
২০১৫ সালের ১২মে একটি কালো সকাল। ক্লাসে উপস্থিত থাকা অবস্থায়ই তাঁকে জড়িয়ে দেওয়া হয় একটি হত্যাকাণ্ডের সাথে। ব্লগার অনন্ত বিজয় দাস হত্যা হয়েছিলেন তখন। এই হত্যা কান্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়। অথচ তাঁর অবস্থান, চলাফেরা সবই ছিল স্পষ্ট ও প্রমাণিত। হত্যা কান্ডের সময় তিনি ছিলেন ক্লাসে। তার অপরাধ ছিল ব্লগারদের ইসলাম বিদ্বেষী লেখালেখির জবাব দেয়া। সত্যকে তুলে ধরা। কিন্তু তখন সত্যের কণ্ঠরোধ করা ছিল সময়ের নিয়ম।
শুরু হয় অন্ধকার অধ্যায়। মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার, অমানবিক রিমান্ড, অকথ্য নির্যাতন, মানবতার সমস্ত সীমা লঙ্ঘিত হয় তাঁর উপর। স্বীকারোক্তি আদায়ের নামে চলে পাশবিক অত্যাচার। তবুও তিনি মিথ্যার কাছে মাথা নত করেননি। সত্যের পক্ষে অবিচল ছিলেন শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত।
নির্যাতনের ভার সইতে পারেনি তাঁর দেহ। ক্ষতবিক্ষত হয় মস্তিষ্ক, বিকল হয়ে পড়ে কিডনি। এক সময় তিনি হয়ে ওঠেন মৃত্যুপথযাত্রী। অবশেষে ২০১৭ সালের ২ নভেম্বর, পিজি হাসপাতালের প্রিজন সেলের নিঃসঙ্গ অন্ধকারে তিনি পাড়ি জমান অনন্তের পথে নিঃসঙ্গ, নির্যাতিত, কিন্তু মাথা উঁচু করে।
প্রায় আড়াই বছর পর পরিবার ফিরে পায় তাঁর দেহ—হাড্ডিসার, নিথর। এক বীর পিতা আবারও দাঁড়ান ইতিহাসের সামনে! এইবার সন্তানের লাশ কাঁধে তুলে। কতটা ভারী ছিল সেই মুহূর্ত! ভাষা সেখানে অসহায়।
পরবর্তীতে সাজানো সাক্ষ্য ও জোরপূর্বক আদায় করা জবানবন্দির ভিত্তিতে ২০২২ সালে দেওয়া হয় মৃত্যুদণ্ডের রায়। এই রায় ছিল মূলত জেল হাজতে মৃত্যুর দায় এড়ানোর রায়। কিন্তু যে মানুষটি আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন, তার জন্য এই রায় যেন আরও একবার অন্যায়ের প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে।
যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে হয়তো আজ তিনি হতে পারতেন দেশের একজন কৃতি সন্তান। প্রশাসনে, শিক্ষাঙ্গনে কিংবা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে। কিন্তু ইতিহাস তাকে অন্য ভূমিকায় ডেকেছে একজন শহীদের মর্যাদায়।
শহীদ আব্দুল মান্নান ইয়াহইয়া শুধু একটি নাম নয়, তিনি এক প্রতিবাদ, এক নীরব চিৎকার, এক জ্বলন্ত সত্যের প্রতীক। তাঁর জীবনের বিনিময়ে, তাঁর মতো অসংখ্য নির্যাতিত প্রাণের আত্মত্যাগে একদিন স্বৈরাচারের পতন হয়েছে, মুক্ত হয়েছে দেশ।
তাঁর পিতা যিনি সন্তানের লাশ কাঁধে নিয়েছিলেন, তাঁর বুকফাটা কান্না আকাশ ছুঁয়েছিল। হয়তো সেই আর্তনাদই একদিন ন্যায়ের সূর্যোদয় ডেকে এনেছে।
ইয়াহইয়া ছিলেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র মজলিসের শপথপ্রাপ্ত সদস্য। আজ তিনি ইতিহাসের অংশ অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
সবশেষে যেই কথাটি না বললে নয়! শহীদ ইয়াহইয়ার মামলাটি রিঅপেন করলে একজন বীর হয়তো হত্যাকাণ্ডের দায় থেকে মুক্ত হবেন। আর তখনকার সাজানো নাটকগুলো প্রকাশিত হবে। সেই প্রত্যাশায় রইলাম।
