মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬

লড়াই করে যাচ্ছেন জুতার কারিগরেরা

উজ্জ্বল বাংলাদেশ ডেস্ক

নরসিংদী জেলার আরগীনগর মোড়ে গেলেই প্রথমেই নাকে ভেসে আসে একধরনের তীব্র আঠার গন্ধ। চারপাশে তাকালেই দেখা যায়, বিভিন্ন শিল্পকারখানার বাইরে ছোট ছোট কারিগরদের হাতে তৈরি হচ্ছে জুতা। সেই জুতার আঠার ঘ্রাণই যেন জানান দেয়—এখানে এখনো টিকে আছে ঐতিহ্যবাহী হাতে তৈরি জুতার কারখানা।

একসময় এই হাতে তৈরি জুতার বাজার ছিল জমজমাট। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। এখন ক্রেতার উপস্থিতি আগের মতো চোখে পড়ে না। শুধু ঈদ মৌসুমে কিছুটা ভিড় দেখা গেলেও তা বড় বড় শোরুমের সঙ্গে তুলনা করলে খুবই নগণ্য। ফলে চিরচেনা এসব দোকান ধীরে ধীরে ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়ছে।

এখানকার উদ্যোক্তারা নীরবে নিজেদের কাজ করে যাচ্ছেন। কোথাও কয়েকজন শ্রমিক মিলে জুতা তৈরি করছেন, আবার কোথাও একজন কারিগরই একাই ফিতা কাটা, সেলাই থেকে শুরু করে পুরো জুতা তৈরির কাজ সামলাচ্ছেন।

স্থানীয় এক দোকানদার দিলীপ রবি দাস বলেন, বহু দিন ধরেই তিনি এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। একসময় একটি বড় কোম্পানিতে চাকরি করলেও পরে তা হারিয়ে নিজেই ছোট পরিসরে দোকান গড়ে তোলেন। তিনি বলেন, ‘ঈদ মৌসুম ছাড়া আমাদের প্রায় ক্রেতাশূন্য থাকতে হয়। দুই ঈদ ছাড়া সারা বছরই কষ্টে দিন কাটে। জুতা বিক্রি করে ঠিকমতো সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’ তিনি আরও বলেন, পর্যাপ্ত পুঁজি না থাকায় ব্যবসা বড় করা সম্ভব হচ্ছে না। কিস্তির ওপর নির্ভর করেই চলতে হচ্ছে পুরো বছর। নতুন ডিজাইন বা উন্নত মানের জুতা তৈরির ইচ্ছা থাকলেও অর্থের অভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না।

দিলীপ রবি দাসের মতে, বড় বড় শোরুমের ভিড়ে তাঁদের মতো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের টিকে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের ক্রেতা মূলত নিম্ন আয়ের মানুষ। তাঁরা ৫০০-৬০০ টাকার মধ্যে চামড়ার স্যান্ডেল খোঁজেন। আমরা চাইলে ভালো মানের দামি জুতা তৈরি করতে পারি, কিন্তু তখন ক্রেতারা শোরুমমুখী হয়ে গেছেন।’

পাশের আরেক দোকানদার বিপ্লব কুমার দাস বলেন, প্রায় ২৫-৩০ বছর ধরে তাঁরা এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আগে এত ব্র্যান্ডের দোকান ছিল না। তখন গ্রামাঞ্চল থেকেও আমাদের কাছে অর্ডার আসত। আমরা জুতা তৈরি করে সরবরাহ করতাম। এখন সেই অর্ডার নেই বললেই চলে। সবকিছু বড় কোম্পানির দখলে চলে গেছে।’

নরসিংদী বড় বাজারসংলগ্ন আরেক কারিগর আনিস মিয়া কিছুটা আশার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘এখন ঈদের সময়, তাই ব্যবসা কিছুটা ভালো যাচ্ছে। বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ আসছেন। মাঝে মাঝে কিছু ক্রেতা ভালো মানের জুতা চান, তাঁদের জন্য আমরা উন্নত মানের জুতা তৈরি করি।’

ক্রেতাদের মধ্যেও রয়েছে ভিন্ন বাস্তবতা। অটোচালক রমজান আলী জানান, স্বল্প আয়ের কারণে তিনি শোরুমে গিয়ে জুতা কেনার সামর্থ্য রাখেন না। তিনি বলেন, ‘এখানে কম দামে ভালো জুতা পাওয়া যায়। আমি ৭০০ টাকায় ভালো জুতা কিনেছি। শোরুমে গেলে এত কম দামে পাওয়া সম্ভব না।’

সব মিলিয়ে নরসিংদীর এই হাতে তৈরি জুতাশিল্প এখন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে বড় ব্র্যান্ডের প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে পুঁজির অভাব ও কমে যাওয়া চাহিদা—সবকিছু মিলিয়ে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত মানুষের জন্য টিকে থাকাই যেন এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

নরসিংদী বাজার কমিটির সভাপতি বাবুল সরকার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে বিক্রি কমছে, জুতার বিভিন্ন কাঁচামালের দাম বাড়ছে—সেই তুলনায় জুতার দাম বাড়ছে না। হাতে তৈরি দোকানদারদের বিক্রিতে মন্দা যাচ্ছে। হয়তো এখন ঈদ উপলক্ষে একটু বেচাকেনা ভালো।’

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ সাদেকুল ইসলাম (কবি, সাহিত্যিক, সংগঠক), উপদেষ্টাঃ মোঃ মাহিদুল হাসান সরকার, উপদেষ্টাঃ মোঃ আঃ হান্নান মিলন, প্রকাশকঃ কামরুন নেছা তানিয়া, সম্পাদকঃ রাজিবুল করিম রোমিও-এম, এস, এস (সমাজ কর্ম-রাজশাহী), সহ-সম্পাদকঃ রুবিনা শেখ, ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুল আজিজ, নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসাইন, বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ মিজানুর সরকার

প্রিন্ট করুন