বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬

‘দালাল ছাড়া সেবা নেই’—ময়মনসিংহের ভাবখালী-ঘাগড়া ভূমি অফিসে জনভোগান্তি

মামুনুর রশীদ মামুন, ময়মনসিংহ

ময়মনসিংহ সদর উপজেলার ভাবখালী ও ঘাগড়া ইউনিয়নের একমাত্র ভূমি অফিসকে কেন্দ্র করে ঘুষ বাণিজ্য,দালাল সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ও সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি—ন্যায্য জমি সংক্রান্ত সেবা নিতে গেলেই সাধারণ মানুষকে পড়তে হচ্ছে দালাল চক্রের খপ্পরে,দিতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের ঘুষ। আর ঘুষ না দিলে ফাইল আটকে রাখা, অযথা জটিলতা তৈরি করা কিংবা দিনের পর দিন ঘোরানোর মতো নানা হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগী সেবাগ্রহীতাদের একাংশের অভিযোগ,এই অনিয়ম ও দালাল সিন্ডিকেটের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের নায়েব লুৎফর রহমানের যোগসাজশ রয়েছে। যদিও তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এলো নেপথ্যের চিত্র: স্থানীয় এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলা এবং দীর্ঘ অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভাবখালী-ঘাগড়া ভূমি অফিসে নামজারি, খতিয়ান,পর্চা,জমি খারিজসহ প্রায় সব ধরনের সেবা নিয়ন্ত্রণ করছে একটি সংঘবদ্ধ দালাল সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে—এসব সেবা পেতে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে ৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবি করা হচ্ছে। স্থানীয়রা
জানান,দরিদ্র ও সাধারণ মানুষ দিনের পর দিন অফিসে ঘুরেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে দালালের মাধ্যমে যোগাযোগ না করলে আবেদন প্রক্রিয়া এগোয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে। কম্পিউটার দোকানের আড়ালে ঘুষের কারবার: গোপন অনুসন্ধানে আরও জানা যায়,ভূমি অফিস সংলগ্ন কয়েকটি কম্পিউটার দোকানকে ঘিরেই এই দালাল চক্রের তৎপরতা বেশি। দালালরা নিজেদের পরিচয় দেয় ‘কম্পিউটার দোকানের কর্মচারী’ হিসেবে। এই দোকানগুলোর আড়ালে ফাইল আটকে রেখে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী,সেবার নামে সরাসরি অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি চোখে পড়ছে না বলে দাবি স্থানীয়দের।
সিন্ডিকেটে বহিরাগত নারীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ: অনুসন্ধানে আরও একটি উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে—ত্রিশাল দরগা বাজার এলাকার বহিরাগত এক নারী তাসলিমা নামের ব্যক্তি এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিভিন্নভাবে অর্থ আদায়ে ভূমিকা রাখছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী,তিনি আরওআর খসড়া বাবদ ২০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং মাঠ পর্চার ফটোকপি বাবদ ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত অর্থ আদায় করছেন। অনেক ক্ষেত্রে মূল নথি দেখার সুযোগ না দিয়ে ফটোকপি করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। চিহ্নিত দালালদের নাম প্রকাশ: অনুসন্ধানকারী সূত্রে জানা গেছে,এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের নাম-পরিচয়ও সামনে এসেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন—রফিকুল (পিতা: রমজান আলী, গ্রাম: চুরখায়), সজিব (পিতা: খুশি, গ্রাম: চরখায়), জুম্মন (পিতা: মোতালেব, মৌজা: মদল), রিদয় (পিতা: অজ্ঞাত, গ্রাম: চুরখায়), আব্দুল্লাহ (পিতা: অজ্ঞাত, গ্রাম: নেহালিয়াকান্দা) এবং খালেক (পিতা: মৃত আতা, গ্রাম: পন-ঘাগড়া)। স্থানীয়দের দাবি—এরা নিয়মিতভাবে ভূমি অফিসের আশপাশে অবস্থান করে সেবাগ্রহীতাদের বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে থাকে। প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয়দের অভিযোগ,প্রতিদিন সকালেই দালাল চক্র অফিসের সামনে অবস্থান নেয় এবং সারাদিন সেবাগ্রহীতাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। ফলে প্রকৃত সেবাগ্রহীতারা বারবার হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এ নিয়ে স্থানীয় সুশীল সমাজের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন—“প্রশাসনের চোখের সামনে এমন দালাল সিন্ডিকেট কীভাবে সক্রিয় থাকে?” তাদের মতে, “স্মার্ট বাংলাদেশের কথা বলা হলেও বাস্তবে মাঠপর্যায়ে এমন দুর্নীতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।”
অভিযোগ অস্বীকার নায়েবের: তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের নায়েব লুৎফর রহমান। তিনি বলেন,
“আমি বরং দালাল চক্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি। এ কারণে আমাকে জড়িয়ে বিভিন্ন অভিযোগ তোলা হচ্ছে। ভূমি অফিসকে দালালমুক্ত করতে অফিসের পেছনের রাস্তা টিন দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে,যাতে বাইরের দালালদের আনাগোনা বন্ধ করা যায়।”
তবে সরেজমিনে দেখা গেছে,ওই টিনের গেট থাকলেও দালালদের উপস্থিতি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং অফিস এলাকায় দালালদের প্রভাব এখনো দৃশ্যমান বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তদন্তের আশ্বাস প্রশাসনের: অভিযোগের বিষয়ে ময়মনসিংহ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জান্নাতুল ফেরদৌস হ্যাপি বলেন, অভিযোগটি গুরুত্ব সহকারে দেখা হবে। প্রয়োজনীয় তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কঠোর ব্যবস্থা দাবিতে স্থানীয়রা
স্থানীয় নাগরিক সমাজ ও সচেতন মহলের নেতৃবৃন্দের দাবি—দালাল সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। এলাকাবাসীর মতে,ভূমি অফিসে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে না। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়—এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে স্থানীয় জনসাধারণ ও সচেতন মহল।

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ সাদেকুল ইসলাম (কবি, সাহিত্যিক, সংগঠক), উপদেষ্টাঃ মোঃ মাহিদুল হাসান সরকার, উপদেষ্টাঃ মোঃ আঃ হান্নান মিলন, প্রকাশকঃ কামরুন নেছা তানিয়া, সম্পাদকঃ রাজিবুল করিম রোমিও-এম, এস, এস (সমাজ কর্ম-রাজশাহী), সহ-সম্পাদকঃ রুবিনা শেখ, ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুল আজিজ, নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসাইন, বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ মিজানুর সরকার

প্রিন্ট করুন