১৯৭১ আমাদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ও গৌরবময় মানচিত্র উপহার দিয়েছে। সেই মানচিত্রের পেছনে রয়েছে লক্ষ মানুষের ত্যাগ, রক্ত ও স্বপ্ন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, দীর্ঘদিন ধরে সেই স্বাধীনতার মানচিত্রের যথাযথ যত্ন নেওয়া হয়নি। ফলে রাষ্ট্রের অনেক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়েছে, গণতন্ত্রের ভিত নড়বড়ে হয়েছে এবং জনগণের প্রত্যাশা অনেক ক্ষেত্রে অপূর্ণই থেকে গেছে। যেন সময়ের ধুলো-ময়লায় স্বাধীনতার সেই উজ্জ্বল মানচিত্র কিছুটা মলিন হয়ে পড়েছিল।
কিন্তু ২০২৪ আমাদের সেই মলিন মানচিত্রকে নতুনভাবে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করার একটি সুযোগ এনে দিয়েছে। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের বছর নয়; বরং ইনসাফ, জবাবদিহিতা এবং ন্যায্যতার প্রতীক হিসেবে নতুন করে রাষ্ট্রকে গড়ে তোলার একটি সম্ভাবনার বছর। এই পরিবর্তন বাংলাদেশের মানুষকে আবারও বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস ও আত্মবিশ্বাস দিয়েছে।
এই নতুন বাস্তবতার মধ্যেই দেশ সম্প্রতি জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করেছে। কিছু ভুলভ্রান্তি ও সীমাবদ্ধতা থাকলেও সামগ্রিকভাবে জনগণ সেটিকে মেনে নিয়েছে এবং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখেছে। এখন সামনে রয়েছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচন।
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা মূলত গণতন্ত্রের তৃণমূল ভিত্তি। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং জেলা পরিষদ, এই তিন স্তরের প্রতিষ্ঠান জনগণের দৈনন্দিন জীবন ও উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই এই নির্বাচন কেমন হবে, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই জনমনে কিছুটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে- এই নির্বাচন কি দলীয় প্রতীকে হবে, নাকি নির্দলীয় প্রতীকে হবে? এর পাশাপাশি আরেকটি বড় উদ্বেগ রয়েছে- নির্বাচনে প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে “ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং” করা হবে কি না।
অতীতে প্রায়ই দেখা গেছে, সংসদ সদস্যরা তাদের পছন্দের অনুসারী বা ঘনিষ্ঠ নেতাকে উপজেলা চেয়ারম্যান কিংবা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন। আবার উপজেলা চেয়ারম্যানরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য নির্বাচনে নিজেদের অনুগত প্রার্থীদের জিতিয়ে আনতে পক্ষপাতিত্ব করেন। ফলে প্রকৃত গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা অনেক সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
এই বাস্তবতায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা করার প্রয়োজন রয়েছে। একটি কার্যকর উপায় হতে পারে, তা হলো- নির্বাচন প্রক্রিয়া নিচের স্তর থেকে শুরু করা। অর্থাৎ প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য নির্বাচন সম্পন্ন করা, তারপর উপজেলা পরিষদ এবং পরবর্তীতে জেলা পরিষদের নির্বাচন আয়োজন করা।
এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে ওপরের স্তরের রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাব অনেকাংশে কমে যেতে পারে। কারণ, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আগে হলে উপজেলা বা উচ্চপর্যায়ের নেতাদের পক্ষে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে জোর করে প্রতিষ্ঠিত করা সহজ হবে না। এতে স্থানীয় পর্যায়ের প্রার্থীরা জনগণের কাছে গিয়ে সরাসরি সমর্থন আদায়ের সুযোগ পাবেন।
আরও একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা এখানে কাজ করতে পারে। যদি কোনো উপজেলা পর্যায়ের নেতা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিশেষ কোনো প্রার্থীকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেন, তাহলে অন্য প্রার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই ভবিষ্যতে সেই নেতাকে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচনে সমর্থন না-ও করতে পারেন। ফলে একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক ভারসাম্য তৈরি হবে, যা পক্ষপাতিত্ব কমাতে সহায়ক হতে পারে।
তবে মনে রাখতে হবে, শুধু নির্বাচন পদ্ধতির ক্রম পরিবর্তন করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন, প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যদি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্রের ভিত আরও শক্ত হবে।
পরিশেষে বলা যায়, ১৯৭১ আমাদের স্বাধীনতার মানচিত্র দিয়েছে, আর ২০২৪ সেই মানচিত্রকে নতুন করে মর্যাদা দেওয়ার একটি সুযোগ তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে গণতন্ত্রের ভিত্তিকে শক্ত করা। স্থানীয় সরকার নির্বাচন যদি সত্যিকার অর্থে জনগণের অংশগ্রহণ ও আস্থার ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হয়, তবে সেই স্বাধীনতার মানচিত্র শুধু আকাশেই উড়বে না, বরং ইনসাফ, উন্নয়ন ও মর্যাদার প্রতীক হিসেবে বিশ্ব দরবারেও পতপত করে উড়বে।


