মিশরের রাজপ্রাসাদ। সেখানে দাস হিসেবে থাকলেও হযরত ইউসুফ (আ.)-এর ব্যক্তিত্ব ও সৌন্দর্য ছিল কোনো রাজপুত্রের চেয়েও উজ্জ্বল। তাঁর চারিত্রিক পবিত্রতা ছিল এক অনন্য বিস্ময়। কিন্তু এই সৌন্দর্যই তাঁর জীবনে নিয়ে এল এক কঠিন পরীক্ষা।
১. মূর্তির পর্দা ও স্রষ্টার লজ্জা
একদিন প্রাসাদের সব দরজা বন্ধ করে দিয়ে আযীযের স্ত্রী জুলেখা ইউসুফ (আ.)-কে পাপের দিকে আহ্বান করল। কক্ষটি ছিল নির্জন, পরিবেশ ছিল উস্কানিমূলক। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে জুলেখা দৌড়ে গিয়ে ঘরের কোণে রাখা একটি মূর্তিকে কাপড় দিয়ে ঢেকে দিল।
বিস্মিত ইউসুফ (আ.) জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি এমন করলে কেন?” জুলেখা উত্তর দিল, “আমি এই মূর্তির সামনে এমন কাজ করতে লজ্জা বোধ করছি।” ইউসুফ (আ.)-এর ঈমানি সত্তা তখন গর্জে উঠল। তিনি বললেন:
“তুমি যদি এক মৃত ও নির্জীব মূর্তিকে লজ্জা পাও, তবে আমি সেই মহান আল্লাহকে কেন লজ্জা পাব না, যিনি সবকিছু দেখেন এবং যাঁর কাছ থেকে কোনো কিছুই গোপন নেই?”
২. পাপ থেকে পলায়ন ও পেছন থেকে টান
ইউসুফ (আ.) এক মুহূর্ত দেরি না করে দরজার দিকে দৌড়ে পালালেন। তিনি জানতেন, পাপের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা মানেই শয়তানকে সুযোগ দেওয়া। জুলেখা তাঁকে ফেরাতে তাঁর জামার পেছন দিক থেকে টেনে ধরল, ফলে জামাটি ছিঁড়ে গেল। ঠিক তখনই দরজায় এসে উপস্থিত হলেন স্বয়ং আযীয (জুলেখার স্বামী)।
৩. জামা যখন সাক্ষ্য দিল
জুলেখা নিজেকে বাঁচাতে মিথ্যা অভিযোগ তুলল যে, ইউসুফ (আ.)-ই তাকে লাঞ্ছিত করতে চেয়েছেন। কিন্তু সত্যের জয় সুনিশ্চিত। আল্লাহর কুদরতে পরিবারের এক সদস্য সাক্ষ্য দিল—
“যদি জামা সামনে থেকে ছেঁড়া হয়, তবে ইউসুফ অপরাধী। আর যদি পেছন থেকে ছেঁড়া হয়, তবে ইউসুফ নির্দোষ।”
পরীক্ষায় দেখা গেল জামাটি পেছন থেকে ছেঁড়া। আযীয বুঝে গেলেন সব দোষ জুলেখার। তিনি সত্য চাপা দিতে চাইলেন ঠিকই, কিন্তু সত্য বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পড়ল।
৪. সৌন্দর্য ও ছুরির আঘাত
শহরের নারীরা যখন জুলেখাকে নিয়ে কানাঘুষা শুরু করল, তখন সে এক ভোজের আয়োজন করল। সব নারীর হাতে একটি করে ফল ও তীক্ষ্ণ ছুরি দেওয়া হলো। এমন সময় জুলেখা ইউসুফ (আ.)-কে কক্ষের ভেতর দিয়ে হেঁটে যেতে বলল। ইউসুফ (আ.) যখন সামনে এলেন, তাঁর স্বর্গীয় সৌন্দর্য দেখে নারীরা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। ফলের বদলে তারা নিজেদের হাত কেটে রক্তারক্তি করল, তবুও তাদের কোনো খেয়াল ছিল না। তারা চিৎকার করে বলল, “এ তো মানুষ নয়, এ কোনো সম্মানিত ফেরেশতা!”
৫. কারাগারের অন্ধকার ও আল্লাহর আলো
অবশেষে ফিতনা থেকে বাঁচতে এবং সামাজিকভাবে জুলেখাকে বাঁচাতে নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও ইউসুফ (আ.)-কে কারাগারে পাঠানো হলো। তিনি হাসিমুখে জেলখানাকে গ্রহণ করে নিলেন, তবুও পাপের সাথে আপস করলেন না। বছরের পর বছর অন্ধকার কারাবাসে থেকেও তিনি হারাননি তাঁর ধৈর্য ও আল্লাহভীতি। অবশেষে আল্লাহ তাঁকে অপবাদমুক্ত করে মিশরের সর্বোচ্চ রাজসিংহাসনে বসালেন।
গল্পের শিক্ষা:
তাকওয়ার শক্তি: পাপের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর ভয়ে তা প্রত্যাখ্যান করাই হলো প্রকৃত মনুষ্যত্ব।
পাপ থেকে পালানো: যেখানে পাপ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, সেখান থেকে দ্রুত প্রস্থান করাই হলো বুদ্ধিমানের কাজ।
আল্লাহর বিচার: মানুষ মিথ্যা অপবাদ দিলেও আল্লাহ ঠিকই তাঁর প্রিয় বান্দাকে নির্দোষ প্রমাণ করেন এবং সম্মানের উচ্চ শিখরে আরোহণ করান।
