দেশের ব্যান্ডসংগীতে যখন প্রেম, বিচ্ছেদ কিংবা নগরজীবনের ব্যক্তিগত অনুভূতির আধিক্য, তখন একেবারে ভিন্ন সুরে, ভিন্ন দায়বদ্ধতায় টানা দুই দশক ধরে কথা বলে চলেছে নকশীকাঁথা। লোকজ সুরকে হাতিয়ার করে সমাজের অসংগতি, পরিবেশ বিপর্যয় ও মানুষের অধিকার নিয়ে গানে গানে সচেতনতা তৈরি—এই দর্শন নিয়েই ২০ বছর পার করল ব্যান্ডটি।
সংগীতশিল্পী ও সাংবাদিক সাজেদ ফাতেমীর নেতৃত্বে নকশীকাঁথা ব্যান্ড প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৬ সালের ২৫ জানুয়ারি। ২০০৭ সালের ২৫ জানুয়ারি এটি পায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। সময়ের হিসাবে দেখলে ২০ বছর কেবল একটি সংখ্যা; কিন্তু নকশীকাঁথার ক্ষেত্রে এই সময়ব্যাপ্তি মানে সমাজের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক নিরবচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক আন্দোলন।
গান মানেই দায়বদ্ধতা
শুরু থেকেই নকশীকাঁথা নিজেকে আলাদা করে চিহ্নিত করেছে বিষয়বস্তুর কারণে। এখানে গান শুধু বিনোদনের উপকরণ নয়; গান হয়ে উঠেছে প্রশ্ন তোলার, প্রতিবাদ জানানোর এবং মানুষকে ভাবানোর মাধ্যম। নদী ও বৃক্ষ রক্ষা, পরিবেশ ধ্বংস, শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে, নারীর অধিকার, বর্ণবাদ, সীমান্ত সহিংসতা—সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যেসব সংকট সমাজকে ক্ষতবিক্ষত করেছে, নকশীকাঁথার গানে সেগুলোরই প্রতিধ্বনি শোনা যায়।
এই গানগুলোর বড় শক্তি তাদের সুর। দেশের সমৃদ্ধ লোকসংগীতের ভান্ডার থেকে নেওয়া সুর ও ছন্দে তৈরি এসব গান যেন পরিচিত হয়েও নতুন। ব্যান্ডটি মনে করে, বিলুপ্তপ্রায় লোকগানের নানা ধারাকে আধুনিক ব্যান্ডের কাঠামোয় উপস্থাপন করে নকশীকাঁথা একদিকে ঐতিহ্য রক্ষা করেছে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের কানে পৌঁছে দিয়েছে লোকজ সংগীতের ভাষা।
নাটক থেকে গানে
নকশীকাঁথার জন্মকথার পেছনে আছে মাঠে-ঘাটে ঘুরে কাজ করার অভিজ্ঞতা। সাজেদ ফাতেমী বলেন, ‘একসময় আমি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার হয়ে নাটক করতাম। ডেঙ্গু, নারীর প্রজননস্বাস্থ্য, শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে, বর্ণবাদ—এ ধরনের ইস্যু নিয়ে হাটে-মাঠে-ঘাটে ঘুরে ঘুরে প্রায় সাত বছর নাটক করেছি। তখনই মনে হলো, এই বিষয়গুলো গানেও বলা যায়। বরং গানের সুরে নদী, বৃক্ষ ও পরিবেশ বাঁচানোর কথা আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব।’ এই ভাবনা থেকেই নাটকের ভাষা বদলে গেল গানের ভাষায়। লোকজ সুরের সঙ্গে যুক্ত হলো সময়ের কঠিন বাস্তবতা—এভাবেই গড়ে উঠল নকশীকাঁথার নিজস্ব পরিচয়।
