সৃষ্টিতত্ত্বের এক অপার রহস্য হলো নারী ও পুরুষ। নারী প্রকৃতির রূপ এবং পুরুষের পরিপূরক। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ এরশাদ করেছেন: “তিনিই তোমাদের এক ব্যক্তি (আদম) থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে তার সঙ্গিনী (হাওয়া) সৃষ্টি করেছেন, যেন সে তার নিকট প্রশান্তি লাভ করে।” (সূরা আরাফ: ১৮৯)। এই ‘প্রশান্তি’ কেবল শারীরিক নয়, বরং এটি একটি আত্মিক ও দেহতাত্ত্বিক সাধনার স্তর।
**১. পঞ্চরস ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় আধ্যাত্মিকতা:- পুরুষের বীর্য বা রতিকে যে পঞ্চরসের (সোডিয়াম, কার্বোনেট, নাইট্রোজেন, সালফার ও ফসফরাস) কথা বলা হয়েছে, তা দেহতত্ত্বের ভাষায় স্থূল দেহকে সচল রাখার রাসায়নিক উপাদান। সুফি দর্শনে একে বলা হয় ‘মা-এ-তাকভিয়াত’ বা জীবনী শক্তি।
* কোরআনিক প্রেক্ষাপট্:- আল্লাহ বীর্যকে ‘মা-য়িন মাহিন’ বা তুচ্ছ তরল বললেও একে ‘নুতফাতুন আমশাজ’ বা মিশ্রিত বিন্দু হিসেবে অভিহিত করেছেন। সাধকদের মতে, এই মিশ্রণের ভেতরেই লুকিয়ে আছে পরম জ্যোতি।
**২. ভাবনা-র শোধন:- কাম হতে দিব্যভাবনা
পুরুষের রতি উৎপাদনের মূলে থাকে ‘নারী-ভাবনা’। ইসলামি আধ্যাত্মিকতায় (তাসাউফ) একে বলা হয় ‘নাফস’ বা প্রবৃত্তি। যদি এই ভাবনা কেবল জৈবিক চাহিদা মেটানোর হয়, তবে তা ‘কাম’। কিন্তু যখন এই ভাবনায় স্রষ্টার কুদরত বা প্রেমের প্রতিফলন ঘটে, তখন তা হয় ‘দিব্যভাবনা’।
* হাদিসের আলোকে:- রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, “নিশ্চয়ই আমল নির্ভর করে নিয়তের (ভাবনার) ওপর।” যদি একজন সাধক তার সঙ্গিনীকে ‘মহামায়া’ বা আল্লাহর এক নিপুণ সৃষ্টি হিসেবে দেখে তাকে প্রেম নিবেদন করেন, তবে সেই মিলনও ইবাদতে পরিণত হয়।
**৩. রতি সংরক্ষণ ও জীবনী শক্তি:-
আমি আমার পর্যবেক্ষণে এখানে বলতে চাই যে, কাম ভাবনা বিহীন পুরুষের রতি উৎপাদন বন্ধ হয় এবং জীবনী শক্তি হ্রাস পায়। এটি একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম পয়েন্ট। ইসলাম বৈরাগ্যবাদ (رهبانية) সমর্থন করে না। বৈবাহিক জীবন ও সঙ্গিনীর সাহচর্য পুরুষের জীবনী শক্তি ও আত্মিক প্রশান্তিকে ধরে রাখে। রতিকে অপচয় না করে একে ‘সংরক্ষণ’ করাই হলো আসল বীরত্ব। বড় বড় আউলিয়াগণ একেই ‘হাবসে দম’ বা ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ঊর্ধ্বগামী করার প্রক্রিয়া বলেছেন।
**৪. নারীর মায়ারস ও সিদ্দিকা-র রূপ:- নারীর যে রজন বা মায়ারসের কথা আপনি বলেছেন, তা মূলত মাতৃত্ব ও মমত্বের আধার। সুফি দর্শনে নারীকে বলা হয় ‘রাহমান’-এর গুণের বহিঃপ্রকাশ। একজন নারী যখন তার দেহরসকে প্রেমের রসে রূপান্তরিত করেন, তখন তিনি আর কেবল ‘নারী’ থাকেন না, তিনি হয়ে ওঠেন ‘সিদ্দিকা’ বা সত্যের প্রতীক।
* রহস্য:- নারী তার সুপ্ত ইচ্ছা দ্বারা পুরুষকে চালনা করতে পারে। এজন্যই বলা হয়, “একজন সফল পুরুষের পেছনে একজন নারীর হাত থাকে।” এটি কেবল পার্থিব সাফল্য নয়, আধ্যাত্মিক সাধনার পথকেও সুগম করে।
**৫. রতি থেকে মতি এবং জ্যোতি (নূর):- এখানে বর্ণনার সবচেয়ে চমৎকার অংশ হলো রতি থেকে মতির মাধ্যমে জ্যোতিতে পৌঁছানো। একে তাসাউফের ভাষায় বলা হয়:
* নাসুত (স্থূল দেহ/রতি):- কাম ও জৈবিক স্তর।
* মালকুত (মানসিক স্তর/মতি):- যেখানে বুদ্ধি ও বিবেক স্থির হয়।
* লাহুত (জ্যোতি/নূর):- যেখানে সাধক আল্লাহর নূরে বিলীন হয়ে যান (ফানা-ফিলাহ)।
পবিত্র হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন: “বান্দা যখন নফল ইবাদতের (সাধনার) মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করে, তখন আমি তার কান হয়ে যাই যা দিয়ে সে শোনে, তার চোখ হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে, তার হাত হয়ে যাই যা দিয়ে সে ধরে…।” এটাই হলো কাঙ্খিত সাধনার বর্ণিত পরিভাষায় ‘জ্যোতি দেশ’, যেখানে সাধকের চাওয়া আল্লাহর চাওয়া হয়ে যায়।
সর্বপরি, সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে্ আজকের পৃথিবীতে যখন কাম ও নগ্নতার হাতছানি চারদিকে, তখন আমাদের এই দেহতত্ত্বের সাধনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। পুরুষ যদি নারীকে কেবল ভোগের বস্তু না ভেবে ‘মহামায়া’ বা পবিত্র আত্মার আধার মনে করে এবং নারী যদি পুরুষকে তার সাধনার সঙ্গী মনে করে, তবে সমাজে কোনো বিশৃঙ্খলা থাকবে না। রতির অপচয় রোধ করে তাকে জ্ঞানের আলো বা ‘নূরে’ রূপান্তরিত করা-ই হলো সমসাময়িক দেহতত্ত্বের মূল চ্যালেঞ্জ।
