সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা দুটি প্রতিবন্ধী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। একটি স্কুলে ঝুলছে তালা, অন্যটিতে গড়ে তোলা হয়েছে হাঁসের খামার। চাকরির আশায় লাখ লাখ টাকা ডোনেশন দিয়ে নিয়োগ পাওয়া শতাধিক শিক্ষক ও কর্মচারী এখন বেকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, প্রায় পাঁচ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিষ্ঠাতারা আত্মগোপনে রয়েছেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষক-কর্মচারীরা জানান, স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কৌশলে তাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হলেও এখন দায় এড়াতে প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক একে অপরের ওপর দোষ চাপাচ্ছেন। প্রতিষ্ঠাতাদের কেউ অসুস্থতার ভান করছেন, কেউ আবার প্রভাবশালীদের দিয়ে তদবির চালাচ্ছেন—এমন অভিযোগও করেন শিক্ষকরা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৭ সালে তাড়াশ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও তৎকালীন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল হক তার স্ত্রী তাহিরা হকের নামে পৌরসদরের কাউরাইল বাজারে গড়ে তোলেন ‘তাহিরা-হক প্রতিবন্ধী বিদ্যানিকেতন’। সে সময় প্রচারণা চালানো হয়—প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল একজন অটিজম বিশেষজ্ঞ এবং বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালক হওয়ায় এমপিও পেতে কোনো সমস্যা হবে না।
এই প্রচারণায় আকৃষ্ট হয়ে বিভিন্ন পদে তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা করে ডোনেশন দিয়ে প্রায় শতাধিক বেকার তরুণ-তরুণী চাকরিতে যোগ দেন। কেউ কেউ চাকরির শর্তে স্কুলের নামে জমিও রেজিস্ট্রি করে দেন। ওই জমিতে টিনশেড ঘর তুলে স্কুল কার্যক্রম শুরু করা হয়।
নিয়োগ দেওয়া হয়—১ জন প্রধান শিক্ষক, ১ জন সহকারী প্রধান শিক্ষক, ২০ জন সহকারী শিক্ষক, ৬০ জন শিক্ষা সহায়কসহ আয়া, পিয়ন, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, মালি ও নাইটগার্ডসহ প্রায় ২০ জন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী।
শিক্ষকদের অভিযোগ, এমপিও করানোর নামে নামকাওয়াস্তে ম্যানেজিং কমিটি গঠন করে তাহিরা-হক দম্পতি প্রায় চার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন এবং পুরো প্রতিষ্ঠান নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অসুস্থতার অজুহাতে মো. আব্দুল হক ও তাহিরা হক আত্মগোপনে চলে যান। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, স্কুলটির প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ওই ঘটনার পর আর স্কুলটি খোলা হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক জানান, জমি বিক্রি ও এফডিআর ভেঙে কিছু টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও ‘বাড়াবাড়ি করলে কিছুই পাওয়া যাবে না’—এমন হুমকিও দেওয়া হয়েছে। তারা বলেন, “চাকরির বয়স শেষ, টাকা পাব কি না জানি না—জীবনটাই অন্ধকার।”
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. শাহাদৎ হোসেন মুঠোফোনে জানান, তিনি বর্তমানে মুন্সীগঞ্জে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। বিল হলে স্কুলে ফিরবেন। ডোনেশনের টাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি প্রতিষ্ঠাতারা জানেন। এমপিও ও শিক্ষার্থী না থাকা সত্ত্বেও কিভাবে কার্যক্রম চলছে—এমন প্রশ্নে তিনি ফোন কেটে দেন।
প্রতিষ্ঠাতা মো. আব্দুল হকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তার স্ত্রী তাহিরা হক জানান, আব্দুল হক অসুস্থ। স্কুল সংক্রান্ত বিষয়ে প্রধান শিক্ষকই সব জানেন বলে তিনি আর কথা বলতে রাজি হননি।
তবে নিয়োগপত্র ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্যে জানা যায়, সব নিয়োগপত্রে তাহিরা হকের স্বাক্ষর রয়েছে এবং সব আর্থিক লেনদেন তাহিরা-হক দম্পতিই করেছেন। এমনকি খুটিগাছা গ্রামের জীবন সূত্রধরের কাছ থেকে চাকরির শর্তে ৩২ শতাংশ জমিও রেজিস্ট্রি করে নেওয়া হয়। জীবন সূত্রধর বলেন, “চাকরিও হলো না, জমিটাও গেল—এখন কীভাবে চলব জানি না।”
‘চলনবিল বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়’: স্কুলের জায়গায় হাঁসের খামার
তাহিরা-হক বিদ্যানিকেতনের দেখাদেখি ২০১৫ সালে তাড়াশ উপজেলার সগুনা ইউনিয়নের কামারশোন গ্রামে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘চলনবিল বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়’। সাইনবোর্ডে প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি হিসেবে নাম রয়েছে সগুনা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. জহুরুল হক শেখের। তিনি নিজেকে নিরক্ষর বলে দাবি করেন এবং জানান, তার পরিবার বিদ্যালয়ের নামে ২০ শতক জমি দান করেছে।
শিক্ষকদের অভিযোগ, সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নাম ব্যবহার করে এমপিওর আশ্বাস দিয়ে তিনি ২০ জন শিক্ষক, ৬০ জন সহায়কসহ শতাধিক ব্যক্তিকে নিয়োগ দেন। কোনো কোনো পদে একাধিক ব্যক্তিকে নিয়োগের অভিযোগও রয়েছে। এসব নিয়োগের বিনিময়ে প্রায় এক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
৫ আগস্টের পর জহুরুল হক শেখ আত্মগোপনে গেলেও পরে প্রভাবশালীদের মাধ্যমে এলাকায় ফিরে আসেন। বর্তমানে স্কুলটি বন্ধ এবং সেখানে হাঁসের খামার গড়ে তোলা হয়েছে।
প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমান বলেন, “আমি নিজেও টাকা দিয়ে চাকরি নিয়েছিলাম। হঠাৎ স্কুল বন্ধ করে দেওয়ায় এখন বেকার জীবন কাটাচ্ছি।”
জহুরুল হক শেখ বলেন, “এটা আমার পারিবারিক জমি। সরকার এমপিও না দিলে আমি কী করব?” কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, কিছু টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে, বাকিটা তদবিরে খরচ হয়েছে।
প্রশাসনের অজ্ঞতা, নজরদারির ঘাটতি
দুটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য জানতে তাড়াশ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস ও সমাজসেবা অফিসে খোঁজ নেওয়া হলেও কোনো নথি পাওয়া যায়নি। এমনকি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় বা প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের তালিকাতেও এসব প্রতিষ্ঠানের নাম নেই।
তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান বলেন, “বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সিরাজগঞ্জ জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান খান বলেন, “আমি জেলায় নতুন। বিষয়টি সম্পর্কে এখনই কিছু বলতে পারছি না।”
