মদিনার উপকণ্ঠে তখন পরিখা খননের কাজ চলছে। সাহাবীদের পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা, শরীরে ক্লান্তি। দয়ার নবী ﷺ নিজেও ক্ষুধার্ত অবস্থায় পরিখা খনন করছেন। হযরত জাবির (রা.) নবীজিকে কাছ থেকে দেখে শিউরে উঠলেন। নবীজির ক্ষুধার্ত চেহারা দেখে তাঁর কলিজা ফেটে যাচ্ছিল। তিনি দ্রুত পা চালিয়ে নিজের বাড়িতে ফিরলেন।
১. জাবিরের (রা.) ক্ষুদ্র আয়োজন
জাবির (রা.) তাঁর স্ত্রীকে গিয়ে বললেন, “আজ আমি নবীজিকে বড় করুণ ও ক্ষুধার্ত অবস্থায় দেখে এসেছি। ঘরে কিছু আছে কি?” স্ত্রী জানালেন, ঘরে মাত্র এক সা’ (আড়াই কেজির মতো) যব আর একটি ছোট পালিত বকরি আছে। জাবির (রা.) দেরি না করে বকরিটি যবেহ করলেন এবং তাঁর স্ত্রী যব পিষে আটা তৈরি করলেন। উনুনে মাংসের ডেকচি চড়িয়ে জাবির (রা.) যখন বের হচ্ছিলেন, স্ত্রী বারবার করে মনে করিয়ে দিলেন:
“খবরদার! খাবার কিন্তু খুবই অল্প। নবীজিকে একা অথবা মাত্র দুই-তিনজন সাথী নিয়ে আসবেন। বেশি মানুষ এনে আমাকে সবার সামনে লজ্জিত করবেন না যেন!”
২. নবীজির ঘোষণা ও জাবিরের বিস্ময়
জাবির (রা.) পরিখায় গিয়ে নবীজি ﷺ-এর কানে কানে খুব নিচু স্বরে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! ঘরে সামান্য খাবার তৈরি হয়েছে। আপনি আপনার সাথে মাত্র দুই-চারজন সাথী নিয়ে আমার গরিবখানায় চলুন।”
কিন্তু নবীজি ﷺ এক জান্নাতি মুচকি হাসি দিলেন। তিনি জাবিরের গোপন দাওয়াতকে আমজনতার দাওয়াতে পরিণত করে উচ্চস্বরে ঘোষণা দিলেন— “হে খন্দকবাসী! শোনো, আজ জাবির তোমাদের সবার জন্য খাবারের বিশাল আয়োজন করেছে। চলো, সবাই জাবিরের বাড়ি চলো!”
এক হাজার ক্ষুধার্ত সাহাবীর সেই বিশাল বহর দেখে জাবির (রা.)-এর অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। তিনি দৌড়ে বাড়ি গিয়ে স্ত্রীকে সব খুলে বললেন। স্ত্রী প্রথমে আতঙ্কিত হয়ে স্বামীকে তিরস্কার করলেন, কিন্তু যখন শুনলেন নবীজি নিজে এই ঘোষণা দিয়েছেন, তখন তিনি আল্লাহর ওপর ভরসা করে শান্ত হলেন।
৩. আল্লাহর রাসূলের বরকতময় স্পর্শ
রাসূলুল্লাহ ﷺ জাবিরের ঘরে প্রবেশ করলেন। তিনি আটার খামিরে এবং ফুটন্ত মাংসের ডেকচিতে নিজের পবিত্র লালা মিশিয়ে বরকতের দোয়া করলেন। স্ত্রীকে নির্দেশ দিলেন— “হাঁড়ি যেন চুলা থেকে না নামানো হয় এবং রুটি পেষার জন্য আরেকজন সাহায্যকারী ডাকো।”
শুরু হলো ইতিহাসের এক অবিশ্বাস্য ভোজ। সাহাবীরা দশজন দশজন করে ঘরে প্রবেশ করছেন, পেট ভরে তৃপ্ত হয়ে মাংস-রুটি খেয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। জাবির (রা.) অবাক হয়ে দেখলেন—ঝুড়ি থেকে রুটি নেওয়া হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আটার খামির একটুও কমছে না। ডেকচি থেকে বড় বড় হাতা দিয়ে মাংস পরিবেশন করা হচ্ছে, অথচ ডেকচি তখনও আগের মতোই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ফুটছে।
৪. অলৌকিক ফলাফল
জাবির (রা.) বিস্ময়ভরা চোখে বর্ণনা করেন:
“আল্লাহর কসম! সেই এক হাজার মানুষ তৃপ্তিভরে খেল। সবাই খেয়ে চলে যাওয়ার পরও আমাদের ডেকচি সেই আগের মতোই টইটম্বুর ছিল এবং আমাদের আটার খামির থেকে তখনও রুটি বানানো যাচ্ছিল।”
সামান্য আড়াই কেজি যব আর একটি ছোট বকরি দিয়ে এক হাজার মানুষ খেলেন, আর তারপরও অনেক খাবার অবশিষ্ট রয়ে গেল। এটাই ছিল রহমাতুল্লিল আলামিন ﷺ-এর হাতের বরকত এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান উপহার।
গল্পের শিক্ষা:
১. বরকতে বিশ্বাস: যেখানে মানুষের সাধ্য শেষ হয়, সেখান থেকেই আল্লাহর কুদরত শুরু হয়। ২. ধৈর্য ও মেহমানদারি: জাবির (রা.) ও তাঁর স্ত্রী অল্প খাবারেও নবীজির মেহমানদের হাসিমুখে আপ্যায়ন করেছিলেন। ৩. নবীর প্রতি ভালোবাসা: নিজের পেটে ক্ষুধা থাকা সত্ত্বেও নবীজির ক্ষুধার কথা ভেবে জাবির (রা.)-এর অস্থির হওয়া ছিল প্রকৃত ঈমানের লক্ষণ।
সূত্র: সহীহ বুখারী,মুসলিম
