একদিন আল্লাহর নবী হযরত মূসা (আঃ) এক রাস্তার পাশ দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। তিনি সেখানে এক অত্যন্ত দরিদ্র ব্যক্তিকে দেখতে পেলেন, যে বালির ভেতরে শরীর ডুবিয়ে বসে আছে। তার গায়ে কোনো কাপড় ছিল না, তাই সে লজ্জায় বালু দিয়ে শরীর ঢেকে রেখেছে।
লোকটি হযরত মূসা (আঃ)-কে দেখে আর্তনাদ করে বলল:
“হে আল্লাহর নবী! আমার জন্য একটু দোয়া করুন। আল্লাহ যেন আমাকে অন্তত বেঁচে থাকার মতো সামান্য কিছু রিযিক দান করেন। অভাবের তাড়নায় আমি আর বাঁচতে পারছি না।”
ফকিরের করুণ অবস্থা দেখে হযরত মূসা (আঃ)-এর দয়া হলো। তিনি আল্লাহর কাছে লোকটির সচ্ছলতার জন্য দোয়া করলেন এবং সেখান থেকে চলে গেলেন। কিছুকাল পরে আল্লাহর নবীর সেই দোয়াও কবুল হলো।
সম্পদ ও করুণ পরিণতি
কিছুদিন পর হযরত মূসা (আঃ) ওই পথ দিয়েই ফিরছিলেন। তিনি দেখলেন, রাস্তায় বিশাল জটলা। অনেক মানুষ ভিড় করে আছে। তিনি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “এখানে কী হয়েছে? এত ভিড় কেন?”
লোকেরা তাঁকে জানাল:
“কিছুদিন আগে যে ভিক্ষুকটি বালির নিচে শরীর ঢেকে পড়ে থাকত, সে হঠাৎ কিছু সম্পদ পেয়েছিল। কিন্তু টাকা পেয়ে সে মদ খেয়ে মাতাল হয়েছে। এরপর মাতলামি করতে গিয়ে ঝগড়া করে এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছে। এখন তার ‘কিসাস’ বা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রস্তুতি চলছে।”
হতদরিদ্র জীবন থেকে হঠাৎ সম্পদ পেয়ে লোকটি যে এই করুণ পরিণতি বরণ করেছে, তা দেখে হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহর প্রজ্ঞার স্বীকারোক্তি দিলেন এবং নিজের আবদারের জন্য ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, আল্লাহ কেন সেই ব্যক্তিকে অভাবী করে রেখেছিলেন।
শেখ সাদী (রহঃ)-এর উপমা
এই ঘটনাটি উল্লেখ করে আল্লামা শেখ সাদী (রহঃ) কিছু চমৎকার উপমা ও প্রবাদ ব্যবহার করেছেন, যা আল্লাহর প্রজ্ঞাকে তুলে ধরে:
১. দুর্বলতা ও অত্যাচার: “বেচারা বিড়ালের যদি ডানা থাকত, তবে সে দুনিয়া থেকে সব চড়ুই পাখির বংশ শেষ করে দিত।” ২. ধ্বংসের কারণ: দার্শনিক প্লাটো বলেছেন: “পিঁপড়ার পাখা না থাকাই ভালো। কারণ পাখা গজালে সে উড়ে বেড়াবে এবং নিজের ধ্বংস ডেকে আনবে।” ৩. কুরআনের ঘোষণা: পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন: “যদি আল্লাহ তাঁর সব বান্দাকে অঢেল রিযিক দিতেন, তবে তারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করত।” (সূরা শুরা: ২৭) ৪. পিতার জ্ঞান: “বাবার কাছে অনেক মধু আছে, কিন্তু তিনি জ্বরে আক্রান্ত ছেলেকে তা খেতে দেন না। কারণ তিনি জানেন, মধু মিষ্টি হলেও জ্বরের রোগীর জন্য তা ক্ষতিকর।”
শিক্ষা:
অতএব, যিনি তোমাকে ধনী করেননি, তিনি তোমার ভালো-মন্দ তোমার চেয়েও বেশি জানেন। আল্লাহর ফয়সালা মানুষের বাহ্যিক চাওয়া নয়, বরং তার গোপন কল্যাণ ও নিরাপত্তার জন্য হয়। দরিদ্রতা বা অভাবী অবস্থাও কখনো কখনো আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য এক ধরনের হেফাযত (সুরক্ষা) হতে পারে।

