মদিনার তপ্ত রোদে চারপাশ খাঁ খাঁ করছে। একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর কলিজার টুকরো কন্যা হযরত ফাতেমা (রা.)-এর ঘরে প্রবেশ করলেন। তাঁর দুই নয়নের মণি হাসান ও হুসাইনকে না দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “মা ফাতেমা! আমার দুই নাতি কোথায়?”
১. ক্ষুধার কষ্ট ও পিতার মমতা
ফাতেমা (রা.)-এর কণ্ঠ আজ ভারী। তিনি মৃদু স্বরে উত্তর দিলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আজ সকাল থেকে আমাদের ঘরে খাবারের এক দানা পরিমাণও অবশিষ্ট নেই। ক্ষুধার্ত শিশুরা খাবারের জন্য কাঁদবে, সেই দৃশ্য দেখার শক্তি হযরত আলীর নেই। তাই তিনি তাদের নিয়ে বাইরে কোথাও চলে গেছেন যাতে তাদের মন অন্যদিকে ঘুরে থাকে।”
নবীজি ﷺ-এর পবিত্র হৃদয়ে এক চিনচিনে ব্যথা অনুভূত হলো। তিনি তাঁর আদরের সন্তানদের সন্ধানে শহরের প্রান্তে বেরিয়ে পড়লেন।
২. কূপের পাড়ে আলীর (রা.) সংগ্রাম
খুঁজতে খুঁজতে নবীজি ﷺ দেখলেন—শহরের শেষ সীমানায় এক ইহুদি ব্যক্তির কূপের ধারে হাসান ও হুসাইন মনের আনন্দে খেলা করছে। তাদের সামনে পড়ে থাকা কয়েকটা শুকনো খেজুর। রোদের তীব্রতায় তাদের ছোট ছোট মুখগুলো লাল হয়ে গেছে। পাশেই হযরত আলী (রা.) ঘাম ঝরিয়ে কাজ করছেন। তিনি প্রতি বালতি পানি তোলার বিনিময়ে একটি করে খেজুর পারিশ্রমিক পাচ্ছিলেন।
নবীজি ﷺ আলীকে ডেকে বললেন, “হে আলী! রোদের তেজ তো বাড়ছে। প্রচণ্ড গরম পড়ার আগেই কি আমার দুই আদরের শিশুকে নিয়ে বাড়ি ফিরবে না?”
আলী (রা.) বিনীতভাবে আরজ করলেন:
“ইয়া রাসূলাল্লাহ! ঘরে একদম খাবার নেই। আমি চাচ্ছি আরও কিছুক্ষণ পরিশ্রম করে কয়েকটা খেজুর বেশি জমা করতে, যাতে আজ ফাতেমা এবং এই সন্তানদের মুখে কিছু খাবার তুলে দিতে পারি।”
৩. নবীজির কাঁধে জান্নাতের সরদার
আল্লাহর নবী ﷺ সেখানেই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন। আলী (রা.) তাঁর পারিশ্রমিকের খেজুরগুলো একটি ছোট্ট কাপড়ে পুঁটুলি বাঁধলেন। এরপর শুরু হলো এক জান্নাতি যাত্রা।
পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ ﷺ একজন নাতিকে নিজের কাঁধে তুলে নিলেন, আর আলী (রা.) অন্যজনকে নিলেন। খেজুরের সেই ছোট্ট পুঁটুলিটি হাতে নিয়ে তাঁরা অভাবের সংসার ছেড়ে আনন্দের সাথে বাড়ির দিকে রওনা হলেন। তাঁদের চোখেমুখে কোনো অভিযোগ ছিল না, ছিল কেবল আল্লাহর ওপর অগাধ ভরসা।
গল্পের শিক্ষা:
পরিশ্রমের মর্যাদা: জান্নাতের গ্যারান্টি পাওয়া সত্ত্বেও হযরত আলী (রা.) অন্যের অধীনে কায়িক পরিশ্রম করে রিযিক তালাশ করেছেন। ইসলাম ভিক্ষাবৃত্তিকে নয়, মেহনতকে সম্মান দেয়।
অল্পে তুষ্টি: জান্নাতী নারীদের সর্দারিনী হয়েও মা ফাতেমা (রা.) অনাহারে থেকেছেন, কিন্তু কখনো ধৈর্য হারাননি।
পারিবারিক বন্ধন: নবীজি ﷺ-এর এই ঘটনা আমাদের শেখায় যে, কঠিন সময়ে পরিবারের পাশে থাকা এবং সন্তানদের কষ্ট ভাগ করে নেওয়াই প্রকৃত মহত্ব।
সূত্র: আত-তারগীব ওয়াত তারহীব,তাবরানী
