সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬

গভীর সমুদ্রের মেহমান: হযরত ইউনুস (আঃ)-এর কাহিনী

উজ্জ্বল বাংলাদেশ ডেস্ক

হযরত ইউনুস (আ.) আল্লাহর আদেশের অপেক্ষা না করেই যখন এক জাহাজ ভর্তি যাত্রীদের সাথে রওনা হলেন, তখন মাঝপথে এক প্রচণ্ড ঝড় শুরু হলো। জাহাজের ভার কমাতে লটারির আয়োজন করা হলে তিনবারই ইউনুস (আ.)-এর নাম উঠল। সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের মাঝে একটি জাহাজ বিপদে পড়েছিল। সেই জাহাজের যাত্রীদের মধ্যে ছিলেন মহান আল্লাহর নবী হযরত ইউনুস (আঃ)। আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি উত্তাল সমুদ্রের ঢেউয়ের মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আর সাথে সাথেই বিশাল এক মাছ আল্লাহর নির্দেশে তাঁকে গিলে ফেলল।
আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআন মাজিদে ইরশাদ করেনঃ
অর্থ: “অতঃপর একটি মাছ তাঁকে গিলে ফেলে, আর তিনি নিজেকে ভৎসনা করছিলেন।” (সূরা আস-সাফফাত, আয়াত ১৪২)
১. মাছের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ
ঠিক সেই মুহূর্তে আল্লাহর আদেশে সাগরের এক বিশাল মাছ দ্রুতগতিতে সেখানে উপস্থিত হলো। মাছটি কোনো সাধারণ শিকারি ছিল না, বরং সে ছিল আল্লাহর আজ্ঞাবহ এক দাস। মাছটি নবীকে গিলে ফেলল, কিন্তু তাকে চিবিয়ে খাওয়ার বা হজম করার কোনো অনুমতি তার ছিল না।
মাছের পেটে প্রবেশের পর হযরত ইউনুস (আঃ) যখন নিজেকে জীবিত আবিষ্কার করলেন, তখন এক অলৌকিক ঘটনা ঘটল। মাছটি নবীর সাথে কথা বলে উঠল। বিনীত স্বরে মাছটি বলল:
“হে আল্লাহর নবী! আপনাকে ভালোভাবে রাখার জন্য আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেন আপনার কোনো কষ্ট না হয়। আমার পেট এখন আপনার কারাগারস্বরূপ। যখন আল্লাহ ইচ্ছা করবেন, তখন আপনাকে মুক্তি দেবেন। আমার পেট সমস্ত প্রকার অপবিত্রতা থেকে মুক্ত। আপনি সম্পূর্ণ পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন স্থানে অবস্থান করছেন। আমি সর্বদা আল্লাহ তাআলার যিকির ও তাসবিহ পাঠে নিমগ্ন থাকি। এখন আমার পেটই আপনার কারাগার।”
২. সাত সমুদ্রের গভীরে এক ইবাদতখানা
মাছের পেটের সেই অন্ধকার জগতটি হযরত ইউনুস (আঃ)-এর জন্য এক পবিত্র ইবাদতখানায় পরিণত হলো। মাছটি তাকে নিয়ে সাগরের তলদেশে ভ্রমণ করতে লাগল। এভাবে একে একে সাত সমুদ্রের গভীর তলদেশে মাছটি পৌঁছে গেল।
সেখানে এক অদ্ভুত দৃশ্য! গভীর পানির নিচেও হযরত ইউনুস (আঃ) আল্লাহর অগণিত নিদর্শন দেখতে পেলেন। তিনি শুনতে পেলেন সাগরের নুড়ি-পাথর, মাছ এবং জলজ প্রাণীরা আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করছে। নবীও সেই সুরের সাথে সুর মিলিয়ে অবিরাম আল্লাহর যিকিরে মগ্ন হয়ে রইলেন।
এভাবে চল্লিশ দিন কেটে গেল। মাছটি তার মুখ খোলা রাখত যাতে নবীর শ্বাস-প্রশ্বাসে কোনো কষ্ট না হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় মাছের পেটে অবস্থান এবং মানসিক অস্থিরতায় তার শরীর অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে ইরশাদ করেন—
অর্থ: “সুতরাং তিনি যদি তাসবিহ পাঠকারীদের অন্তর্ভুক্ত না হতেন, তবে অবশ্যই কিয়ামত পর্যন্ত সে মাছের পেটেই অবস্থান করতেন।”
(সূরা আস-সাফফাত, আয়াত ১৪৩-১৪৪ )
৩. অন্ধকারের আর্তনাদ ও মুক্তি
গভীর সাগরের অন্ধকার, মাছের পেটের অন্ধকার এবং রাতের অন্ধকার—এই তিন অন্ধকারের মাঝখান থেকে হযরত ইউনুস (আঃ) কাতর স্বরে প্রভুকে ডাকলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া কওম ত্যাগ করা তার উচিত হয়নি। অনুতপ্ত হৃদয়ে তিনি সেই ঐতিহাসিক দোয়াটি পাঠ করলেন:
“লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জালিমি মিন।” (অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আপনি পবিত্র, নিশ্চয়ই আমি অন্যায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত।)
আল্লাহ তাআলা তার প্রিয় নবীর এই আন্তরিক ডাক শুনলেন। তিনি মাছকে নির্দেশ দিলেন তার আমানত ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। আল্লাহর আদেশে মাছটি তীরের দিকে সাঁতার কাটল এবং এক নির্জন ও শুষ্ক নদীর পাড়ে হযরত ইউনুস (আঃ)-কে উগরে দিল।
৪. নতুন জীবন ও করুণার ছায়া
মাছের পেট থেকে মুক্তি পাওয়ার পর শুকরিয়াস্বরূপ হযরত ইউনুস (আঃ) চার রাকাত নামাজ আদায় করলেন, যা ছিল আসরের সময়। কিন্তু তখন তার শারীরিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। তার চামড়া গলে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল, শরীর ছিল একেবারে নিস্তেজ। সূর্যের প্রখর তাপ সহ্য করার মতো শক্তি তার ছিল না।
তখন আল্লাহর দয়ায় সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে একটি লাউগাছ (ইয়াকতিন) জন্মাল এবং দ্রুত বড় হয়ে তাকে ছায়া দিতে লাগল। এই গাছের বিশাল পাতাগুলো তাকে রোদের তাপ ও পোকা-মাকড় থেকে রক্ষা করল। হযরত ইউনুস (আঃ) সেই গাছের লাউ খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করতে লাগলেন।
আল্লাহর কুদরতে সেখানে একটি পাহাড়ি বকরিও আসত। তিনি সেই বকরির দুধ পান করতেন। লাউয়ের পুষ্টি এবং বকরির দুধের শক্তিতে ধীরে ধীরে তিনি সুস্থ হয়ে উঠতে লাগলেন। শরীরে বল ফিরে পেলেন এবং মনে প্রশান্তি অনুভব করলেন।
৫. জাতির কাছে প্রত্যাবর্তন
সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার পর আল্লাহর নির্দেশে তিনি আবার তার নিজ কওমের কাছে ফিরে গেলেন। যে এক লক্ষাধিক মানুষকে তিনি ছেড়ে এসেছিলেন, তারা ততদিনে নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে ঈমান এনেছিল। হযরত ইউনুস (আঃ)-কে ফিরে পেয়ে তারা আনন্দে আত্মহারা হলো। আল্লাহ তাআলা তাদের তাওবা কবুল করলেন এবং একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সুখ-শান্তিতে জীবনযাপনের সুযোগ দিলেন।
কিছুটা শক্তি ফিরে পাওয়ার পর আল্লাহ তাআলার নির্দেশে তিনি স্বীয় কওমের কাছে ফিরে যান। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন—
অর্থ:
“অতঃপর আমি তাঁকে এক উন্মুক্ত ময়দানে স্থাপন করলাম, তখন তিনি অসুস্থ ছিলেন; এবং আমি তাঁর উপর একটি লতাযুক্ত ছায়াবৃক্ষ জন্মিয়েছিলাম। এরপর আমি তাঁকে এক লক্ষ বা ততোধিক লোকের প্রতি রাসূল করে পাঠিয়েছিলাম। অতঃপর তারা ঈমান আনল, তাই আমি তাদেরকে এক নির্ধারিত সময় পর্যন্ত ভোগ-বিলাসের সুযোগ দিয়েছিলাম।”
(সূরা আস-সাফফাত, আয়াত ১৪৫-১৪৮)
এই গল্পের শিক্ষা: বিপদ যত গভীরই হোক না কেন, আল্লাহকে ডাকার মতো ডাকলে তিনি অবশ্যই উদ্ধার করেন। হযরত ইউনুস (আঃ)-এর এই ঘটনা আমাদের শেখায় যে, ভুল স্বীকার করা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা মুমিনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ সাদেকুল ইসলাম (কবি, সাহিত্যিক, সংগঠক), উপদেষ্টাঃ মোঃ আঃ হান্নান মিলন, প্রকাশকঃ কামরুন নেছা তানিয়া, সম্পাদকঃ রাজিবুল করিম রোমিও-এম, এস, এস (সমাজ কর্ম), নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসাইন, ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুল আজিজ, সহ-ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ খন্দকার আউয়াল ভাসানী, বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ মিজানুর সরকার

প্রিন্ট করুন