🌋 আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগেকার কথা। পৃথিবীতে তখন রাজত্ব করতেন এক ন্যায়পরায়ণ এবং প্রতাপশালী রাজা, যার নাম জুলকারনাইন। তিনি ঘোড়ায় চড়ে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়াতেন এবং অন্যায়ের বিনাশ করে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করতেন।
১. জুলকারনাইন ও অসহায় মানুষের আর্তনাদ
ভ্রমণ করতে করতে জুলকারনাইন দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী এক জনপদে পৌঁছালেন। সেখানকার মানুষেরা ছিল অত্যন্ত অসহায়। তারা জুলকারনাইনকে এক ভয়ংকর সংবাদ দিল। তারা বলল, “হে জুলকারনাইন! পাহাড়ের ওপাড়ে ‘ইয়াজুজ ও মাজুজ’ নামের এক বর্বর জাতি বাস করে। তারা যখনই এপারে আসে, হত্যা-লুণ্ঠন আর ধ্বংসলীলায় মেতে ওঠে। আপনি কি আমাদের বাঁচাবেন? বিনিময়ে আমরা আপনাকে কর (টাকা) দেব।”
জুলকারনাইন উত্তর দিলেন, “আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন তা তোমাদের সম্পদের চেয়ে উত্তম। তোমরা শুধু আমাকে শারীরিক শ্রম দিয়ে সাহায্য করো, আমি তোমাদের মাঝে এক নিশ্ছিদ্র প্রাচীর তৈরি করে দেব।”
২. লোহার সেই নিশ্ছিদ্র বেষ্টনী
জুলকারনাইনের আদেশে হাজার হাজার টন লোহা আনা হলো। তিনি দুই পাহাড়ের মাঝখানে লোহার বিশাল স্তূপ সাজিয়ে তাতে আগুনের প্রচণ্ড তাপ দিলেন। লোহা যখন লাল হয়ে গলে গেল, তখন তার ওপর গলিত তামা ঢেলে দেওয়া হলো। তৈরি হলো এক দুর্ভেদ্য মিশ্রণ— ‘রদমা’। এটি ছিল এমন এক প্রাচীর যা এতই মসৃণ যে তার ওপর চড়া অসম্ভব, আর এতই শক্ত যে তা ফুটো করাও অসাধ্য। এভাবেই ইয়াজুজ ও মাজুজ নামের সেই দানবীয় জাতিকে পৃথিবীর বুক থেকে আলাদা করে দেওয়া হলো।
৩. প্রতিদিনের ব্যর্থ চেষ্টা ও একটি ‘ইনশাআল্লাহ’
হাজার হাজার বছর ধরে এই বর্বর জাতিটি সেই প্রাচীরের ওপাড়ে বন্দি আছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তারা প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেই প্রাচীর খুঁড়তে থাকে। খুঁড়তে খুঁড়তে যখন প্রাচীরটি একদম পাতলা হয়ে যায় এবং ওপাড়ে সূর্যের আলো দেখা যায়, তখন তাদের সর্দার বলে, “আজ চল, বাকিটুকু কাল শেষ করব।” কিন্তু তারা ‘ইনশাআল্লাহ’ বলে না। ফলে পরের দিন এসে তারা দেখে প্রাচীরটি আল্লাহর হুকুমে আগের চেয়েও বেশি মজবুত হয়ে গেছে।
এভাবে প্রতিদিন তারা ব্যর্থ হয়। কিন্তু কিয়ামতের ঠিক আগে, যখন আল্লাহর ইচ্ছা হবে, তখন তাদের সর্দার বলবে— “চলো আজ ফিরে যাই, ‘ইনশাআল্লাহ’ কাল বাকিটা শেষ করব।” এই একটি ‘ইনশাআল্লাহ’র বরকতে পরদিন তারা প্রাচীরটি ফুটো করতে সক্ষম হবে এবং পঙ্গপালের মতো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে।
৪. তিবিরিয়া হ্রদ ও শেষ পরিণতি
ইয়াজুজ ও মাজুজ যখন বের হবে, তখন তাদের সংখ্যা হবে অগনিত। তারা যখন ফিলিস্তিনের তিবিরিয়া হ্রদের পাশ দিয়ে যাবে, তখন তাদের প্রথম দলটি হ্রদের সব পানি খেয়ে শেষ করে ফেলবে। তারা যা পাবে তা-ই খাবে, যাকে পাবে তাকেই হত্যা করবে। দুনিয়ার সব মানুষকে শেষ করে তারা আকাশের দিকে তীর ছুড়বে। আল্লাহ তাদের পরীক্ষা করার জন্য তীরে রক্ত মাখিয়ে ফেরত পাঠাবেন। তারা ভাববে, “আমরা জমিন ও আসমানের সবাইকে শেষ করে ফেলেছি।”
৫. ঈসা (আ.)-এর দোয়া ও কীটের আক্রমণ
সেই চরম ফিতনার সময় হযরত ঈসা (আ.) মুমিনদের নিয়ে পাহাড়ে আশ্রয় নেবেন। ঈসা (আ.)-এর দোয়ার বরকতে আল্লাহ ইয়াজুজ ও মাজুজের ঘাড়ে এক প্রকার ক্ষুদ্র কীটের আক্রমণ পাঠাবেন। এই মহামারীতে কোটি কোটি ইয়াজুজ-মাজুজ একসাথে ধ্বংস হয়ে যাবে। এরপর বিশাল বড় বড় পাখি এসে তাদের মৃতদেহগুলো সাগরে ফেলে দেবে এবং বৃষ্টি দিয়ে পুরো পৃথিবী পবিত্র করা হবে।
গল্পের শিক্ষা:
১. ইনশাআল্লাহর শক্তি: হাজার বছর ধরে কঠোর শ্রম দিয়ে যা সম্ভব হয়নি, একটি ‘ইনশাআল্লাহ’র কারণে তা সম্ভব হবে। আল্লাহর ওপর সব কাজে নির্ভর করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য। ২. অনিবার্য ধ্বংস: জুলুম ও অহংকারের পরিণতি সব সময়ই ধ্বংসাত্মক। ইয়াজুজ-মাজুজ নিজেদের অপরাজেয় ভাবলেও একটি সামান্য পোকা দিয়ে আল্লাহ তাদের ধ্বংস করবেন। ৩. ঈমানের পরীক্ষা: শেষ জমানায় টিকে থাকতে হলে খাঁটি ঈমান ও আল্লাহর ওপর অটল বিশ্বাস অপরিহার্য।
