সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬

দুই নদীর সঙ্গমস্থলে রহস্যময় সফর

উজ্জ্বল বাংলাদেশ ডেস্ক

একদা হযরত মূসা (আঃ) বনী ইসরাঈলের এক বিশাল জনসভায় অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ভাষণ দিচ্ছিলেন। জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করলেন, “হে আল্লাহর নবী! এই পৃথিবীতে বর্তমানে সবচেয়ে বড় জ্ঞানী ব্যক্তি কে?” মূসা (আঃ) বিনয়ের সাথে উত্তর দিলেন, “আমি।”
আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় নবীর এই উত্তরটি পছন্দ করলেন না, কারণ তিনি জ্ঞানের মূল উৎস হিসেবে আল্লাহর নাম নেননি। আল্লাহ ওহী পাঠালেন, “হে মূসা! দুই নদীর সঙ্গমস্থলে আমার এমন এক বান্দা আছে, যার জ্ঞান তোমার চেয়েও বেশি।” মূসা (আঃ) লজ্জিত হলেন এবং সেই জ্ঞানীর সন্ধান পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন।
১. সাগরের বুকে চড়ুই পাখির শিক্ষা
দীর্ঘ সফরের পর মূসা (আঃ) জনৈক ব্যক্তির সাক্ষাৎ পেলেন, যাঁর নাম খিজির (আঃ)। মূসা (আঃ) তাঁকে সালাম দিয়ে বললেন, “আমি আপনার কাছে এসেছি সেই সঠিক জ্ঞান শিখতে, যা আল্লাহ আপনাকে শিখিয়েছেন।”
খিজির (আঃ) মৃদু হেসে বললেন, “হে মূসা! আল্লাহর কিছু জ্ঞান আমার আছে যা আপনি জানেন না, আবার আপনার কাছে কিছু জ্ঞান আছে যা আমি জানি না। তবে আমার সাথে থাকতে হলে আপনাকে ধৈর্য ধরতে হবে। আপনি কি পারবেন?” মূসা (আঃ) ওয়াদা করলেন তিনি ধৈর্য ধরবেন।
সফরের শুরুতে তাঁরা একটি নৌকায় উঠলেন। তখন একটি চড়ুই পাখি এসে সাগরের পানিতে ঠোঁট ডুবিয়ে এক ফোঁটা পানি পান করল। খিজির (আঃ) বললেন, “হে মূসা! এই পাখিটি তার ঠোঁটে করে যতটুকু পানি নিল, আল্লাহর অসীম জ্ঞানের সমুদ্র থেকে আমার আর আপনার জ্ঞান ঠিক ততটুকুই সামান্য। ভাবুন তবে আল্লাহর জ্ঞান কত বিশাল!”
২. তিনটি রহস্যময় ঘটনা ও ধৈর্যের পরীক্ষা
প্রথম ঘটনা: মাঝপথে খিজির (আঃ) হঠাৎ কুঠার দিয়ে নৌকার একটি তক্তা ভেঙে ফেললেন। মূসা (আঃ) অবাক হয়ে বললেন, “এ কী করলেন? মাঝিরা দয়া করে আমাদের বিনে পয়সায় পার করে দিচ্ছে, আর আপনি তাদের নৌকা ফুটো করে ডুবিয়ে দিতে চাইছেন?” খিজির (আঃ) বললেন, “আমি কি বলিনি আপনি ধৈর্য ধরতে পারবেন না?” মূসা (আঃ) ক্ষমা চাইলেন।
দ্বিতীয় ঘটনা: নৌকা থেকে নেমে তাঁরা বনের পথে হাঁটছিলেন। হঠাৎ খিজির (আঃ) এক কিশোরকে দেখা মাত্র হত্যা করলেন। মূসা (আঃ) শিউরে উঠলেন, “আপনি একটি নিষ্পাপ শিশুকে বিনাপরাধে মারলেন? এটি তো জঘন্য অন্যায়!” খিজির (আঃ) পুনরায় সেই শর্তের কথা মনে করিয়ে দিলেন।
তৃতীয় ঘটনা: তাঁরা এক কৃপণ জনপদে পৌঁছালেন। ক্ষুধার্ত থাকলেও গ্রামবাসীরা তাঁদের আতিথ্য দিল না। সেখানে একটি দেয়াল হেলে পড়েছিল। খিজির (আঃ) বিনা পরিশ্রমে সেটি মেরামত করে দিলেন। মূসা (আঃ) বললেন, “তারা আমাদের খাবার দিল না, আর আপনি তাদের দেয়াল সারিয়ে দিলেন? মজুরি নিলেও তো খাবার কেনা যেত!”
৩. রহস্যের পর্দা উন্মোচন
এবার খিজির (আঃ) বললেন, “মূসা! এখানেই আমাদের বিচ্ছেদ। তবে শোনো এর পেছনের রহস্য—যা আল্লাহ আমাকে জানিয়েছেন কিন্তু তোমার চোখে ধরা পড়েনি।”
নৌকা: সামনে এক জালেম রাজা সব ভালো নৌকা কেড়ে নিচ্ছিল। আমি নৌকাটি ত্রুটিযুক্ত করে দিলাম যেন রাজা এটি না নেয় এবং দরিদ্র মাঝিরা পরে মেরামত করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে।
বালক: ওই শিশুটি বড় হয়ে চরম অবাধ্য হতো এবং তার নেককার পিতামাতাকে কুফরিতে লিপ্ত করত। আল্লাহ তার বদলে তাঁদের উত্তম সন্তান দেবেন।
দেয়াল: ওই দেয়ালের নিচে দুই এতিম শিশুর গুপ্তধন লুকানো ছিল। দেয়ালটি ভেঙে পড়লে সম্পদ চুরি হয়ে যেত। আল্লাহ চাইলেন তারা বড় হয়ে যেন বাবার রেখে যাওয়া সম্পদ খুঁজে পায়।
মূসা (আঃ) স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, আমরা চোখে যা দেখি তার আড়ালে আল্লাহর এক বিশাল পরিকল্পনা থাকে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে যা অনিষ্ট মনে হয়, তার গভীরেও পরম কল্যাণ লুকায়িত থাকতে পারে।
গল্পের শিক্ষা:
১. বিনয়: পৃথিবীর সব জ্ঞান আল্লাহর দান। নিজেকে বড় জ্ঞানী মনে করা অহংকার, যা আল্লাহ পছন্দ করেন না। ২. ধৈর্য: আল্লাহর হেকমত বা রহস্য বোঝা মানুষের সীমিত বুদ্ধির কাজ নয়। তাই বিপদে অস্থির না হয়ে ধৈর্য ধরা উচিত। ৩. দৃষ্টিভঙ্গি: সব সময় যা দেখা যায় তাই চূড়ান্ত সত্য নয়; প্রতিটি ঘটনার পেছনে আল্লাহর এক সূক্ষ্ম বিচার ও মঙ্গল নিহিত থাকে।

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ সাদেকুল ইসলাম (কবি, সাহিত্যিক, সংগঠক), উপদেষ্টাঃ মোঃ আঃ হান্নান মিলন, প্রকাশকঃ কামরুন নেছা তানিয়া, সম্পাদকঃ রাজিবুল করিম রোমিও-এম, এস, এস (সমাজ কর্ম), নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসাইন, ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুল আজিজ, সহ-ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ খন্দকার আউয়াল ভাসানী, বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ মিজানুর সরকার

প্রিন্ট করুন