বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬

বিশ্ব শিক্ষক দিবস: ইতিহাস, তাৎপর্য

মোঃ আব্দুল কাদের শিক্ষক, তাড়াশ কলেজ

শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না, বরং শিক্ষার্থীর ভেতরে ভবিষ্যৎ সমাজ গড়ার স্বপ্ন রোপন করেন। অথচ শিক্ষকদেরই প্রায়শই সমাজে অবহেলিত হতে হয়। তাই, বিশ্ব শিক্ষক দিবস কেবল আনুষ্ঠানিক উদযাপন নয়, বরং শিক্ষকদের মর্যাদা, অধিকার ও সহযোগিতামূলক পেশা হিসেবে তাদের ভূমিকার পুনর্নির্মাণ এখন সময়ের দাবী। কারণ, শিক্ষক সমাজের দিকনির্দেশক শক্তি। জ্ঞান, মূল্যবোধ এবং মানবিক গুণাবলি সঞ্চার ও বিকাশে তাদের অবদান অপরিসীম।
তারই ধারাবাহিকতায়, শিক্ষকের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাদের পেশাগত মর্যাদাকে উন্নীত করার জন্য এবারের “আন্তর্জাতিক শিক্ষক দিবস-২০২৫” এর প্রতিপাদ্য ছিলো “Recasting Teaching as a Collaborative Profession” অর্থাৎ, একটি সহযোগী পেশা হিসেবে শিক্ষকতার পুনর্গঠন। এটি কেবল শিক্ষকদের সম্মান প্রদর্শনের দিন নয়, বরং শিক্ষকদের অবস্থান, চ্যালেঞ্জ এবং নীতিগত সংস্কারের প্রশ্নেও বৈশ্বিক আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি করে।মোটা দাগে বলতে গেলে, পেশায় শিক্ষক শিক্ষককে, শিক্ষক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে, শিক্ষক সঠিক শিক্ষা দানের মাধ্যমে জাতি ও দেশকে সহযোগিতা করবে। ঠিক একইভাবে সরকার, দেশ, জাতি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও শিক্ষককে পাঠদানে ও স্বাভাবিক জীবন যাপনে সহযোগিতা করবে।
এই দিবসটির সূত্রপাত ঘটে ১৯৬৬ সালে, যখন প্যারিসে অনুষ্ঠিত একটি সম্মেলনে ইউনেস্কো (UNESCO) এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) যৌথভাবে “Recommendation concerning the Status of Teachers” শীর্ষক দলিল গ্রহণ করে। এই সুপারিশে শিক্ষকদের অধিকার, দায়িত্ব, পেশাগত মান, প্রশিক্ষণ, কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক মর্যাদার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে ইউনেস্কো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে যে প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে পালিত হবে। দিনটির সঙ্গে ঐতিহাসিক প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে, কারণ ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবরেই শিক্ষক পেশার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেই আন্তর্জাতিক সুপারিশ গ্রহণ করা হয়েছিল।
এই দিবসের তাৎপর্য বহুমাত্রিক। প্রথমত, এটি শিক্ষক সমাজের অবদানকে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি প্রদান করে। সমাজ গঠন, জ্ঞানের প্রসার এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মূল্যবোধ সঞ্চারে শিক্ষকরা যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, তা আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসে। দ্বিতীয়ত, দিবসটি শিক্ষকদের পেশাগত সমস্যাবলি উন্মোচনের মঞ্চ হিসেবে কাজ করে। বেতন-ভাতা, প্রশিক্ষণের সুযোগ, কর্মপরিবেশ, সামাজিক মর্যাদা এবং পেশাগত নিরাপত্তা—এসব বিষয়ে নীতি নির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। তৃতীয়ত, দিবসটি শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কার এবং নীতিগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে আনে, যাতে শিক্ষকরা শুধু শিক্ষার্থী গঠনে নয়, বরং সমাজ পরিবর্তনেও সক্রিয় অংশীদার হতে পারে।
২০২৫ সালের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য হলো “Recasting Teaching as a Collaborative Profession”। এর মাধ্যমে ইউনেস্কো শিক্ষক পেশাকে নতুনভাবে কল্পনা করার আহ্বান জানিয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে শিক্ষকতা একটি একক কার্যক্রম হিসেবে দেখা হয়, যেখানে একজন শিক্ষক নিজের কক্ষে আলাদা হয়ে পাঠদান করেন। কিন্তু আধুনিক শিক্ষা বাস্তবতায় এটি পর্যাপ্ত নয়। বর্তমান বিশ্বে শিক্ষকতা কেবল একক দায়িত্ব নয়, বরং একটি সহযোগিতামূলক কার্যক্রমে রূপান্তর হওয়া প্রয়োজন।
এই প্রতিপাদ্যের মূল বক্তব্য হলো, শিক্ষকরা যেন পেশাগতভাবে সমবায়ী মনোভাব গড়ে তোলেন। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে যৌথভাবে পাঠ পরিকল্পনা করা, সহকর্মীর শ্রেণি পর্যবেক্ষণ করে মতামত দেওয়া, অভিজ্ঞতা বিনিময় করা, বহুবিষয়ক সহযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষাদানকে সমৃদ্ধ করা এবং শিক্ষার্থীর উন্নয়নের জন্য সমষ্টিগত দায়িত্ব গ্রহণ করা। সহযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষকরা কেবল নিজেদের দক্ষতা বাড়ান না, বরং শিক্ষার্থীদের শেখার মানও বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
এই প্রতিপাদ্যের প্রাসঙ্গিকতা আজকের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সুস্পষ্ট। শিক্ষাক্ষেত্র এখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি—ডিজিটাল রূপান্তর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, বহুসাংস্কৃতিক শিক্ষার পরিবেশ, এবং শিক্ষার মান রক্ষায় ক্রমবর্ধমান চাপ। এসব মোকাবিলা করতে একজন একক শিক্ষকের পক্ষে সম্ভব নয়। সহযোগিতামূলক পদ্ধতিই পারে শিক্ষকদের নতুন কৌশল উদ্ভাবন, অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি এবং পেশাগত সহায়তার মাধ্যমে কার্যকর ভূমিকা রাখতে।
তবে এই রূপান্তরের পথে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহকর্মী সহযোগিতা ও সমবায়ী সংস্কৃতি যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সময়ের সীমাবদ্ধতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং কিছু শিক্ষকের এককভাবে কাজ করার অভ্যাস এই সহযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এ কারণে প্রাতিষ্ঠানিক নীতিতে পরিবর্তন আনা জরুরি, যাতে শিক্ষকদের জন্য সহযোগিতা ও পারস্পরিক শিক্ষণ একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়।
আবার বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রতিপাদ্যের তাৎপর্য আরও গভীর। এখানে এখনও শিক্ষক পেশা অধিকাংশ ক্ষেত্রে এককতার ভেতরে সীমাবদ্ধ। স্কুল বা কলেজ পর্যায়ে যৌথ পাঠ পরিকল্পনা বা Curriculum Design , সহকর্মী পর্যবেক্ষণ বা সমবায়ী গবেষণা বা professional Learning Community (PLC) কার্যক্রম খুব বেশি দেখা যায় না। অনেক শিক্ষক একা কাজ করতে অভ্যস্ত, এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও সহযোগিতামূলক মনোভাব বা Educational Leadership গড়ে তোলার পর্যাপ্ত সুযোগ দেয় না। এর সঙ্গে যোগ হয় অতিরিক্ত ক্লাস লোড, সীমিত প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের ঘাটতি। ফলে সহযোগিতামূলক পেশা হিসেবে শিক্ষকতা প্রতিষ্ঠা করা বাংলাদেশে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো শিক্ষকদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ বিশেষকরে অর্থনৈতিক সুবিধাদি রাষ্ট্রীয়ভাবে বিবেক বর্জিত হওয়ায় বাংলাদেশে SDG-4 বাস্তবায়ন খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ সাদেকুল ইসলাম (কবি, সাহিত্যিক, সংগঠক), উপদেষ্টাঃ মোঃ আঃ হান্নান মিলন, প্রকাশকঃ কামরুন নেছা তানিয়া, সম্পাদকঃ রাজিবুল করিম রোমিও-এম, এস, এস (সমাজ কর্ম), নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসাইন, ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুল আজিজ, সহ-ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ খন্দকার আউয়াল ভাসানী, বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ মিজানুর সরকার

প্রিন্ট করুন